মিশন স্কুলে ছাত্রী হিসেবে ভর্তি হওয়ার পরে চন্দ্রপ্রভা এবং তাঁর বোন রজনীপ্রভার জীবনে কিছু অভাবনীয় পরিবর্তন এল। স্কুলের পরিবেশ গ্রামের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। পারিপার্শ্বিকতার কথা তো বাদই, গ্রামের পঙ্কিলতা এবং বিশৃঙ্খলার পরিবর্তে কেবল শৃঙ্খলা এবং পারিপাট্য। বিশাল বিশাল সব শ্রেণিকক্ষ। ঘণ্টা, মিনিট অনুসরণ করে কর্মসূচি। চারপাশে শৃঙ্খলা এবং নিয়মানুবর্তিতা বিরাজমান। নিয়াই পন্ডিত নামে একজন অসমিয়া শিক্ষক ছাড়া বাকিরা সবাই ছিলেন মহিলা শিক্ষয়িত্রী। মিশনারি কয়েকজনকে সাহায্য করতেন কলকাতা থেকে আগত মিশন স্কুলের শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ নিয়ে আসা কয়েকজন অসমিয়া শিক্ষয়িত্রী। প্রথমেই দুই বোনের নাম পরিবর্তিত হয়েছিল। দুই বোন চন্দ্রপ্রিয়া এবং রামেশ্বরীর নাম পরিবর্তিত হয়ে যথাক্রমে চন্দ্রপ্রভা এবং রজনীপ্রভা হল। নামের মধ্যে আধুনিকতার পরিচয় রয়েছে। নাম ছাড়াও দুই বোনের সাজপোশাকেও পরিবর্তন দেখা গেল। ব্রিটিশ রাজশক্তির অসমে আগমনের পরে অন্যান্য পরিবর্তনের সঙ্গে অসমিয়া মহিলাদের পারম্পরিক রিহা, মেখেলা এবং চাদর পরার মধ্যেও কিছুটা সংশোধন দেখা গেল। ব্লাউজ বা সেমিজ, পেটিকোট পরার নিয়ম আগে ছিল না। এখন এইসব অসমিয়া মহিলাদের পরিধানের অংশ হল। জীবনের গতিশীলতায় অনেক পরিবর্তন এল। নিয়মানুবর্তিতা এবং অনুশাসন স্কুলটিতে অন্যতম গুণ বলে মনে করা হত। মিশনারিদের, স্কুলের ছাত্রী, শিক্ষয়িত্রী, কর্মচারীদের কাজকর্ম ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে করতে হত। ঘুম থেকে উঠার পর থেকে রাতের বেলা বিছানায় যাওয়া পর্যন্ত প্রত্যেককেই নিজের কর্তব্য পরিচ্ছন্নভাবে পালন করতে হত। প্রায় রবিবারেই বাইবেলের শিক্ষয়িত্রী শ্রীমতী লঙ ছাত্রীদের নিয়ে স্কুলের সীমানার বাইরে বেড়াতে যেতেন। কিশোরী চন্দ্রপ্রভা সবুজে ঘেরা নগাওঁয়ের ছোট-বড় পাহাড়, বিভিন্ন ফুলের সুবাস, নানা ধরনের পাখির কাকলি সমৃদ্ধ প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় একাত্মতা অনুভব করতেন। কখনও কখনও ছাত্রীদের নিয়ে কলং নদীর পারে নিয়ে যাওয়া হত।
চন্দ্রপ্রভা এবং রজনীপ্রভা দুই বোনই পড়াশোনার প্রতি অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন। গ্রামের সংকীর্ণ পরিবেশ থেকে এসে নগাঁও শহরে উপযুক্ত শিক্ষার পরিবেশ পেয়েছেন। মিশনারি স্কুলের শিক্ষয়িত্রীরা সাত সাগর তের নদী পার হয়ে এই দেশের মেয়েদের মধ্যে শিক্ষার আলোক বিতরণ করার জন্য প্রাণপনে চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তাই চন্দ্রপ্রভা মনে মনে সংকল্প করেন ভবিষ্যতে নারীদের শিক্ষার জন্য কিছু একটা করতে হবে। চন্দ্রপ্রভার রক্তে নিহিত হয়ে থাকা চিন্তার প্রথম প্রতিফলন ঘটে ছিল এই মিশন স্কুলেই।
১৯১৭ সনে চন্দ্রপ্রভা নগাঁও মিশন স্কুল থেকে ইংরেজি মাইনর (M.E.) পাস করে বেরিয়ে এসেই নগাঁও বালিকা বিদ্যালয়ের প্রাইমারি বিভাগে শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন। এখানে তিনি কয়েক মাস ছিলেন। এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই তিনি নগাঁও শহরের মুখ্য মহিলাদের নিয়ে নগাঁও মহিলা সমিতি নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। খগেন্দ্রীপ্রিয়া বরুয়াকে সভানেত্রী এবং স্বর্ণলতা বরুয়াকে সম্পাদিকার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তখন চন্দ্রপ্রভা ষোলো বছরের যুবতী মাত্র। চন্দ্রপ্রভা বিশ্বাস করতেন যে মহিলারা একত্রিত হয়ে যদি সমিতি স্থাপন করে, সাহিত্যচর্চা ও করে তাহলে নারী-জীবনের অনেকখানি বিকাশ ঘটবে এবং সমাজের কুসংস্কার দূরীভূত হয়ে স্ত্রী শিক্ষাকে অনেকখানি এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে।
১৯১৮ সনে চন্দ্রপ্রভা তেজপুরে নতুন করে প্রতিষ্ঠিত বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষয়িত্রী রূপে নিযুক্ত হন। মহাবাহু ব্রহ্মপুত্রের তীরে পাহাড় সমতলের অপূর্ব সমন্বয়ে গড়ে ওঠা, বাণ রাজার কন্যা উষার রোমান্টিক প্রেমে সমৃদ্ধ শোণিতপুর, তেজপুর। সবাই বলে থাকেন এই তেজপুর শহর সাহিত্য-সংস্কৃতি, রাজনৈতিক চেতনায় সমগ্র অসমের মধ্যে অগ্রণী। এই চেতনায় সমৃদ্ধ তেজপুরের যুবশক্তির উদ্যম যুবতী চন্দ্রপ্রভার অন্তরে র্নিহিত থাকা কর্মোদ্যমকে জাগ্রত করে তোলে। তেজপুরের সামাজিক জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে থাকা আগরওয়ালা পরিবারের পরমানন্দ আগরওয়ালা এবং তাঁর পত্নী কিরণময়ী আগরওয়ালা স্বাভাবিকভাবেই চন্দ্রপ্রভাকে আদর করে কাছে টেনে নিলেন। ফলে চন্দ্রপ্রভার পক্ষে অতি দ্রুত তেজপুরের সামাজিক জীবনের সঙ্গে মিশে যাওয়া সম্ভব হয়েছিল। এইসময় তেজপুরে অসম ছাত্র সম্মেলনের বিরাট অধিবেশনের আয়োজন করা হয়েছিল। জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা ছিলেন স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর অধিনায়ক, অমিয় কুমার দাস ছাত্র সম্মেলনের সম্পাদক। জ্যোতিপ্রসাদ স্বেচ্ছাসেবিকাদের কুচকাওয়াজ শেখানোর দায়িত্ব দিলেন চন্দ্রপ্রভাকে। অমিয়কুমার দাস নিজেই উত্থাপন করা আফিম নিবারণ প্রস্তাবের সমর্থনের জন্য চন্দ্রপ্রভাকে অনুরোধ করলেন। জীবনে প্রথমবারের জন্য চন্দ্রপ্রভা জনগণের মঞ্চে দাঁড়িয়ে কথা বলার সুযোগ পেলেন। ঘুমন্ত সিংহিনী যেন সেদিন গর্জন করে উঠল। প্রতিটি শব্দ যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ হয়ে চন্দ্রপ্রভার কণ্ঠ থেকে নির্গত হতে লাগল। সভায় উপস্থিত প্রত্যেকেই এই অসামান্য নতুন প্রতিভাকে স্বাগত জানাল। চন্দ্রপ্রভা যেন সূর্যের প্রভার মত জ্বলজ্বল করছিলেন।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন