রবিবার, ১ আগস্ট, ২০২১

আমাদের চন্দ্রপ্রভা শইকীয়ানী - ৬ (বাসুদেব দাস)

 

চন্দ্রপ্রভা শইকীয়ানী এবং দণ্ডিনাথ কলিতার প্রেমের সম্পর্ক সাহিত্যচর্চার মধ্য দিয়ে আরম্ভ হয়েছিল যদিও এর পূর্ণ বিকাশ ঘটে ১৯২০ সনে, মহাত্মা গান্ধির দ্বারা পরিকল্পিত এবং পরিচালিত অসহযোগ আন্দোলনের পটভূমিতে। সেই সনের ডিসেম্বর মাসে অসম অ্যাসোসিয়েশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশন তেজপুরে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কলকাতায় অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের অধিবেশনে গ্রহণ করা অসহযোগ আন্দোলনের প্রস্তাবটি পূর্ণ সমর্থন করে ১৯২০ সনে অসমেও আন্দোলন শুরু করার প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। যদিও আগে থেকেই কয়েকজন সম্ভ্রান্ত মহিলা কংগ্রেসের সভায় অংশ গ্রহণ করে আসছিলেন, প্রকৃতপক্ষে এই সময় থেকে সাধারণ মহিলাদের জন্য কংগ্রেসের প্রবেশ দ্বার উন্মুক্ত করা হয়। মহাত্মা গান্ধির পরিকল্পনা অনুসারে অসহযোগ আন্দোলনে মহিলাদের জন্য নির্দিষ্ট এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। ১৯২১ সনের আগস্ট মাসে কার্যসূচি প্রচার করার জন্য গান্ধিজি স্বয়ং অসমে আসেন। সঙ্গে আসেন মহম্মদ আলি এবং তাঁর বোরখা পরিহিতা পত্নী বেগম আলি। তেজপুর সহ গান্ধিজি ভ্রমণ করা প্রতিটি শহরে গান্ধিজি বেগম আলিকে নিয়ে একটি পৃ্থক মহিলা সভার আয়োজন করে সভায় উপস্থিত মহিলাদের আন্দোলনের কার্যসূচি বুঝিয়ে দিয়ে তাদের সহযোগিতা আহ্বান করা হয়। বলাবাহুল্য তেজপুরের সমস্ত কার্যসূচিতে চন্দ্রপ্রভা ওতঃপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। তেজপুরে থাকা সময়টুকু চন্দ্রপ্রভা গান্ধীজিকে ছায়ার মতো অনুসরণ করেছিলেন। সেদিন থেকেই গান্ধিজির অনুসরণকারী হয়ে উঠলেও গান্ধিজির বাণীর দুটি অংশ বিশেষভাবে তার মনে গেঁথে গিয়েছিল— নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রতি দেওয়া আহ্বান এবং অস্পৃশ্যতা বিরোধী সংগ্রাম।

        স্ত্রীশিক্ষা এবং নারী স্বাধীনতার বিষয়কে কেন্দ্র করে দণ্ডিনাথ কলিতার মনে যে আলোড়নের সৃষ্টি হয়েছিল তা কলিতা রচিত দুটি উপন্যাস— ‘সাধনা’ (১৯২৮) এবং আবিষ্কার’ (১৯৪৮) উপন্যাসে ফুটে উঠেছে। সাধনা উপন্যাসের ঘটনাকাল ১৯১০ সনের স্বদেশী আন্দোলন বলা হয়েছে যদিও উপন্যাসটি যে সাম্প্রতিক কালের ঘটনাবলী নিয়ে গড়ে উঠেছে সেই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। সাধনা’ উপন্যাসের নায়ক দীনবন্ধু একজন আদর্শ গান্ধিবাদী। অসহযোগ আন্দোলন স্থগিত হওয়ার পরে গান্ধির প্রস্তাবিত গঠনমূ্লক পরিকল্পনার সমর্থনে তিনি স্ত্রী-শিক্ষা, শিল্পের ক্ষেত্রে তাঁর জাতীয়তাবাদী চিন্তার জন্য অবশেষে তাকে জেলে যেতে হয়। কিন্তু উপন্যাসটির প্রধান উদ্দেশ্য দীনবন্ধুর চরিত্রকে কেন্দ্র করে স্ত্রী-শিক্ষা সম্বন্ধে লেখকের নিজের কিছু ধারণা ব্যক্ত করা। এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে তিনি তিনটি বিপরীতধর্মী নারী চরিত্রের অবতারণা করেছেন। তিনজনেই শিক্ষিতা, কিন্তু বিভিন্ন ধরনের শিক্ষার প্রভাব তাদের চরিত্রে বিভিন্নভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। প্রধান নায়িকা প্রভাবতীর শিক্ষার অভিজ্ঞতা বিষয়ে বিশেষ কিছু বলা হয়নি যদিও তাঁর চরিত্রে পাশ্চাত্য শিক্ষার ছাপ পড়েছে। সে ছোট ভাইয়ের সঙ্গে বাড়ি থেকে দূরে ঘর ভাড়া করে থাকে এবং একটি অসমিয়া বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করে তাতে শিক্ষয়িত্রী হওয়ার পরিকল্পনা করে। তাঁর বাড়িতে পুরুষের আসার কোনো বাধা নিষেধ নেই। অভ্যাগতের সঙ্গে বসে নানা বিষয়ে আলোচনা করে। প্রভাবতীর চরিত্র এবং কার্যকলাপের সঙ্গে তেজপুরের চন্দ্রপ্রভা দাসের সঙ্গে অনেক সাদৃশ্য রয়েছে। বলা যায় যে এই চরিত্রটি চন্দ্রপ্রভার আদলে তৈরি। দুটি চরিত্রের মধ্যে অন্য একটি সাদৃশ্য হল চন্দ্রপ্রভার মতো প্রভাবতীও স্ত্রী শিক্ষার প্রসারের জন্য উৎসর্গীকৃত।

১৯১৯ সনে চন্দ্রপ্রভার অন্য একটি প্রতিভা বা ক্ষমতা সবাইকে মুগ্ধ করেছিল— তা হল তাঁর মিলন সূত্র রচনার ক্ষমতা। ১৯১৯ সনে তেজপুরে অনুষ্ঠিত অসম অ্যাসোসিয়েশনের অধিবেশনে নতুন কমিটি গঠন সম্পর্কে যে তুমুল বাকবিতণ্ডার সৃষ্টি হয়েছিল, তার পরিসমাপ্তি ঘটানো সম্ভব হয়েছিল চন্দ্রপ্রভার অপূর্ব যুক্তির দ্বারা। প্রসন্ন কুমার বরুয়া তাঁর যুক্তিকে সমর্থন জানিয়ে তাঁর ব্যক্তিত্বকে অভিনন্দন জানিয়েছিল। এই সভায় কর্মবীর চন্দ্রশর্মার ওজস্বী বক্তৃতার পরে চন্দ্রপ্রভাব আলোড়ন সৃষ্টিকারী ভাষণ সবাইকে মুগ্ধ করেছিল। ১৯২১ সনের ২০ আগস্ট গান্ধিজি তেজপুরে মাটিতে পা রাখেন। গান্ধিজির পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করে তোলার জন্য একটা সংগঠনের প্রয়োজন। তাই চন্দ্রপ্রভা মহিলাদের এই কাজের জন্য সংগঠিত করার ব্রত গ্রহণ করলেন এবং সমগ্র অসমে মহিলা সমিতি গঠন করার স্বপ্ন দেখলেন। ডিব্রুগড়ে ১৯১৫ সনে ডঃ তিলোত্তমা রায়চৌধুরী এবং স্বনামধন্যা অমলপ্রভা দাসের মাতা হেমপ্রভা দাস ‘ডিব্রুগড় মহিলা সমিতি’ নামে স্ত্রী শিক্ষা প্রসারের উদ্দেশ্যে একটি সমিতি গঠন করেন।

        ১৯২৫ সনে নগাঁও শহরে অনুষ্ঠিত সাহিত্য সভার অধিবেশনে একটি অভাবিত ঘটনা ঘটেছিল— যে ঘটনাকে অসমের মহিলা সমাজের প্রথম সামাজিক বিদ্রোহ বলা যেতে পারে। চন্দ্রপ্রভা প্রতিনিধি হিসেবে মণ্ডপে বসে থেকে দেখলেন যে শত শত মহিলা চিকের আড়ালে পুরুষদের সংস্পর্শ বাঁচিয়ে বসে রয়েছে। এই অসাম্যের বিরুদ্ধে চন্দ্রপ্রভার বিদ্রোহী মন গর্জে উঠল। তাঁর স্বাধীনচেতা মন এই দৃশ্য সহ্য করতে পারল না। সেই সভায় কার্যসূচি ঘোষণা করার সঙ্গে সঙ্গে চন্দ্রপ্রভা তীব্র জ্বালাময়ী ভাষায় এই অসাম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানালেন। অভ্যর্থনা  সমিতিকে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, জাতির অর্ধেক অংশকে এভাবে চিকের আড়ালে রেখে আমরা সমাজের কোন কল্যাণ সাধন করব? তারপর চিকের আড়ালে উপস্থিত মহিলাদের সম্বোধন করে তিনি গঞ্জনার সুরে বললেন— ‘এভাবে খাঁচার মধ্যে বন্দি হয়ে থাকতে আপনাদের আত্মসম্মানে আঘাত লাগছে না বা লজ্জা করছে না? সিংহিনীর মতো চিকের আড়াল ভেদ করে বেরিয়ে আসছেন না কেন? সঙ্গে সঙ্গে শুয়ে থাকা সিংহিনী যেন জেগে উঠল। এক অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখা গেল। চিক ছিন্ন ভিন্ন করে কিছু সাহসী উজ্জ্বল নয়না, প্রতিভাদীপ্ত মুখ পেছন থেকে এসে সামনের বেঞ্চে বসল। বিপুল জনতা করতালির দ্বারা এগিয়ে আসা মহিলাদের স্বাগত জানাল।

        ১৯২৬ সনে রহায় অসম সাহিত্য সভার অধিবেশন বসে। সেই অধিবেশনের সভাপতি ছিলেন বেণুধর রাজখোঁয়া। তিনিই চন্দ্রপ্রভাকে সেই অধিবেশনে অসম মহিলা সমিতি গঠন করার কথা বলেন এবং নগাঁওয়ের তিক্ত অভিজ্ঞতা ভুলে যাবার জন্য অনুরোধ করেন। একই সঙ্গে লক্ষীপুরের জমিদার সাহিত্যিক নগেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী এবং তখনকার পুলিশ অফিসার ভুবন চন্দ্র দত্ত সংগঠনের কাজ শুরুর করার জন্য চন্দ্রপ্রভাকে অনুরোধ করেন। রাজখোঁয়ার চেষ্টায় বিজনী হলে তাঁর সভাপতিত্বে অসম মহিলা সমিতির প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়। সমিতির সম্পাদিকার দায়িত্ব দেওয়া হয় চন্দ্রপ্রভা শইকীয়ানীকে। তিনি কোলে শিশুপুত্র অতুলকে নিয়ে অসমের প্রতিটি জেলায় গিয়ে গিয়ে যেভাবে সংগঠনের  কাজ করেছিলেন তা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। তিনি নিজের জায়গা দৈশিঙরী, বজালী এবং বরপেটা অঞ্চলে যানবাহনের অসুবিধার জন্য একটা সাইকেল কিনে নিয়েছিলেন, যে কথা সেই অঞ্চলে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। বজালীর মানুষ তাকে বলত— ‘এই যে বাবারা দেখ— তাকিয়ে দেখ, ঐ মেয়েটা কীভাবে সাইকেলে উঠে চলেছে— লাজ-লজ্জা কিছুই নেই।’ কিন্তু এই বিরূপ সমালোচনা চন্দ্রপ্রভাকে কিছুতেই দমিয়ে দিতে পারল না। অসমে চন্দ্রপ্রভাই বোধহয় প্রথম সাইকেলে আরোহিনী মহিলা— দ্বিতীয় জন বোধহয় স্বর্গীয়া জুবেদা বা জয়ী রহমান।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আমাদের চন্দ্রপ্রভা শইকীয়ানী - ৭ (বাসুদেব দাস)

  অতুলের জন্মের পর থেকে দণ্ডিনাথ কলিতা চন্দ্রপ্রভাকে মাসে দশ টাকা করে পাঠাতেন । এই ১০   টাকা দিয়েই মা ছেলেকে সারা মাস চালাতে হত। সেই সময় ...