নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার
কেন নাহি দিবে অধিকার
হে বিধাতা?
নত করি মাথা
পথপ্রান্তে কেন রব জাগি
ক্লান্ত ধৈর্য প্রত্যাশার পুরণের লাগি,
দৈবাগত দিনে?
মণিপুরের রাজকন্যা চিত্রাঙ্গদাকে রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যে অমরতা দান করেছেন। চন্দ্রপ্রভা শইকীয়ানী সেই সৌভাগ্যের অধিকারী ছিলেন না। তাই একই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারিনী হয়েও চন্দ্রপ্রভা শইকীয়ানী অসমেই আজ অনেকটা বিস্মৃতির আড়ালে চলে গেছেন। নিরুপমা বরগোহাঞির ‘অভিযাত্রী’, পুষ্পলতা দাসের ‘অগ্নিস্নাতা চন্দ্রপ্রভা’ বা অঞ্জলি শর্মার ‘চন্দ্রপ্রভা’ অবশ্য এর উজ্জ্বল ব্যতিক্রম।
কে ছিলেন এই চন্দ্রপ্রভা? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে আমাদের উনিশ শতকের অসমের সামাজিক ইতিহাসে ফিরে যেতে হবে। আমরা জানি যে উনিশ শতকে অসম এবং বাংলার মধ্যে সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক একটা নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। বাংলার নবজাগরণের আলোকছটায় অসমের অনেক বরণীয় ব্যক্তিত্ব তাদের চলার পথের দিশা খুঁজে পেয়েছিলেন।
ভারতের নবজাগরণের ইতিহাসে রাজা রামমোহন রায়কে আধুনিক ভারতের স্রষ্টা বলা হয়ে থাকে। প্রচলিত ধর্মমতের বহু কুসংস্কারের বিরোধিতা করে পিছিয়ে পড়া সমাজকে তিনি প্রগতির পথে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। নারীর অধিকার সম্পর্কে দৃঢ়মত পোষণ করে তিনি অনেক যুক্তি দেখিয়েছিলেন। রামমোহনের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে উদারপন্থী নারীবাদের বিশেষ সাদৃশ্য রয়েছে। রামমোহন বিশ্বাস করতেন যে নারীর মনও পুরুষের মতোই স্বাধীন এবং সত্যসন্ধানী। প্রকৃতপক্ষে উনিশ শতকের প্রতিটি সংস্কার আন্দোলনের অন্তরালেই সংস্কারকদের নারীর প্রতি সংবেদনশীলতা এবং তাদের দুঃসহ সামাজিক পীড়ন থেকে মুক্তিদানের একটি প্রয়াস বিশেষভাবে লক্ষ করা যায়। রামমোহনের চেষ্টায় ১৮২৯ সনে ‘সতীদাহ প্রথা রদ’ আইন পাশ করা হয়। নারীর অধিকারের সপক্ষে আইনের জগতে এটি একটি বিশাল পদক্ষেপ। এরপর ১৮৫৬ সনে ‘হিন্দুবিবাহ আইন’ বলবৎ হয়। রামমোহনের অনুপ্রেরণায় বঙ্গদেশে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বিধবা বিবাহ এবং স্ত্রী শিক্ষার পক্ষে প্রবল জনমতের সৃষ্টি করেন। এরজন্য বিদ্যাসাগরকে অনেক সামাজিক লাঞ্ছনার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। বিদ্যাসাগর এবং তাঁর অনুগামীদের চেষ্টায় ১৮৭৮ সনে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্ত্রী পুরুষের শিক্ষার সমান মর্যাদা এবং অধিকার স্বীকৃত হয়। নারীর মনে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা তথা আধুনিক চিন্তর উন্মেষ ঘটানোয় ১৮৬৩ সনে প্রকাশিত ‘বামাবোধিনী’ বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করেছিল।
বঙ্গদেশের নবজাগরণের দুটো প্রধান দিক ছিল স্ত্রী শিক্ষার বিস্তার এবং বিধবা বিবাহের প্রসার। এই নবজাগরণের প্রভাবে অন্ধপ্রদেশে বীরেশলিঙ্গম এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অসমে আনন্দরাম ঢেকিয়াল ফুকন সঞ্জীবিত হয়েছিলেন। আধুনিকতার বার্তা অসমে এসে পৌঁছায় অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে। আনন্দরামের জন্ম ১৮২৯ সনে। ১৮৪৫ সনে কলকাতায় শিক্ষা লাভ করে অসমে প্রত্যাবর্তন কালে নবজাগরণের বার্তা বয়ে নিয়ে আসেন তিনি। মাত্র ত্রিশ বছরে মৃত্যু হওয়া এই যুবক সর্বপ্রথম অসমের সামাজিক, রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক, অর্থনৈতিক সমস্ত ক্ষেত্রেই নতুন বীজ বপন করেছিলেন। আনন্দরাম স্বপ্ন দেখেছিলেন অসমের গ্রামে গঞ্জে হাজার হাজার স্কুল প্রতিষ্ঠার। কেবল স্বপ্ন দেখেই ক্ষান্ত ছিলেন না, সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপায়িত করে তোলার জন্য তিনি প্রাণপণে প্রয়াস করেছিলেন। প্রচলিত সংস্কার ভেঙ্গে তিনি নিজ কন্যা পদ্মাবতীকে বাড়িতে বাংলা এবং ইংরেজি শিখিয়েছিলেন। শিক্ষা লাভ করার জন্য পদ্মাবতীর বিয়ে দেওয়াই মুশকিল হয়েছিল। কুসংস্কারে পরিপূর্ণ তৎকালীন অসমিয়া সমাজ আনন্দরাম এবং তাঁর দাদা যজ্ঞরাম খারঘরীয়া ফুকনের সংস্কারমূলক কাজকর্মে কোনোরকম সহযোগিতা তো করেইনি বরং তাদের জাতিচ্যুত করে একঘরে করার ব্যবস্থা করেছিলেন। আনন্দরামের আদর্শে অনুপ্রাণিত গুণাভিরাম বরুয়া আনন্দরামের বাল্যবন্ধু পরশুরাম বরুয়ার বিধবা পত্নী বিষ্ণুপ্রিয়া দেবীকে আইনমতে রেজিস্ট্রি করে বিয়ে করেন। এই বিয়ে অসমের সামাজিক জীবনে এক বিরাট আলোড়নের সৃষ্টি করেছিল। এই প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে যে গুণাভিরাম কন্যা স্বর্ণলতাকে কলকাতার বেথুন স্কুলে শিক্ষা লাভের জন্য পাঠিয়েছিলেন। স্ত্রী শিক্ষার প্রতি অপরিসীম আগ্রহ ছাড়া আনন্দরাম স্ত্রী-স্বাধীনতার পক্ষে ও ছিলেন। গুণাভিরামের কন্যা স্বর্ণলতা এবং গুয়াহাটির উদয়রাম দাসের কন্যা অমিয়কুমার দাসের মাতা সরলা– এই দুজনই ছিলেন আনুষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করা প্রথম অসমিয়া নারী। উনিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে অসমিয়া সমাজ স্ত্রী শিক্ষার অনুকূলে ছিল না। অসমিয়া সমাজেও বাল্য বিবাহ প্রচলিত ছিল। কিশোরী অবস্থাতেই তারা মাতৃত্ব লাভ করত। নলিনীবালা দেবী, রাজবালা দাসের মতো শিক্ষিতা মহিলারা তাদের নিজেদের আত্মজীবনীতে বলেছেন যে, কুড়ি শতকের প্রথম তিনটি দশক পর্যন্ত নারীর শৃঙ্খলিত সামাজিক অবস্থায় শিক্ষা গ্রহণের পথ মোটেই সুগম ছিল না। রক্ষণশীলতা, জাতিভেদের সংকীর্ণতা, কুসংস্কার, ধর্মান্ধতার শিকার সাধারণ জনগন মেয়েদের শিক্ষাকে অপ্রয়োজনীয় বলেই মনে করত।
অসমে আধুনিকতার অগ্রদূত আনন্দরাম ঢেকিয়াল ফুকনের জন্মের বাহাত্তর বছর পরে ১৯০১ সনের ১৬ মার্চ চন্দ্রপ্রভা শইকীয়ানী অসমের একটি প্রত্যন্ত গ্রাম বজালীর দৈশিঙ্গরীতে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা রাতিরাম মজুমদার গ্রামপ্রধান ছিলেন। তিনি লেখাপড়া জানতেন। শিক্ষার প্রতি তার যথেষ্ট আগ্রহ ছিল। মা গঙ্গাপ্রিয়ার কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও শিক্ষার প্রতি যথেষ্ট আগ্রহী ছিলেন। রাতিরাম একজন ব্যক্তিত্বশালী মানুষ ছিলেন। নানা ধরনের মানুষ তার কাছে আসা যাওয়া করত। সেইসময় অসমে বিশেষ করে নিম্ন অসমে অনেক বাংলা খবরের কাগজ আসত । সেগুলো থেকেও রাতিরাম নানা খবরাখবর পেতেন বলে অনুমান করা যেতে পারে। এই সমস্ত কারণে রাতিরামের মনে আধুনিক চিন্তার একটা প্রভাব পড়েছিল। সন্তানের শিক্ষার প্রতি তিনি আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন।
কামরূপের তৎকালীন এই বজালী মহকুমা ধনে-জনে ঐশ্বর্যশালী ছিল যদিও বিংশ শতাব্দীর সেই শুরুতে বজালীর পরিবেশ ছিল সম্পূর্ণ গ্রাম্য এবং আধুনিক শিক্ষা-দীক্ষা থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত গ্রামাঞ্চল। গুয়াহাটি এবং অসমের দুই একটি শহর ছাড়া সেই সময় সমগ্র অসমে গ্রামীণ পরিবেশ বিরাজ করছিল। দৈশিঙরী গ্রামের মধ্য দিয়ে তখনও বয়ে চলছিল উত্তর দক্ষিণে কালদিয়া এবং পহুমরা নামে দুটি নদী। এই দুই নদীর অকৃপণ দান রসাল মাটির বজালী অঞ্চলকে এখনকার মতো সেই সময় ও শস্যশ্যামলা করে তুলেছিল। সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও বজালী অঞ্চল অন্যান্য অঞ্চল থেকে অনেকটা এগিয়ে ছিল। এখানকার পুরোনো সত্র ডুবির পরিহরেশ্বর দেবালয়ের দেবদাসী নৃ্ত্য সেই সময় অসম বিখ্যাত ছিল। এ ছাড়া অঞ্চলটিতে থাকা বিভিন্ন মঠ-মন্দির এবং সত্রকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন নৃ্ত্য-গীতের চর্চা অঞ্চলটিকে সংস্কৃতির দিক থেকে সমৃদ্ধ করে তুলেছিল। এই অঞ্চলেরই চন্দ্রপ্রভার প্রায় সমসাময়িক ব্রজনাথ শর্মার যাত্রাদল এবং তাঁর নির্দেশনার যাত্রাভিনয় অসমের নাট্য অভিনয়ের জগতে বহুমূল্য অবদান রেখেছিল। অভিনয় শিল্পী ব্রজনাথ শর্মা ছিলেন এক অগ্রণী দুঃসাহসিক স্বাধীনতা যোদ্ধা। রাজনৈতিকভাবেও বজালী অঞ্চল যথেষ্ট সচেতন ছিল। হিরন্ময়ী দেবী ‘মুক্তি সংগ্রামী চন্দ্রপ্রভা’ গ্রন্থে লিখেছেন– ‘১৮৬৯ সনে বিদেশি শাসকের খাজনা বাড়ানোর নীতির প্রতিবাদের উদ্দেশ্যে বজালীর গোবিন্দপুরে প্রজাদের সভার আয়োজন করা হয়েছিল। ১৮৯৩-৯৪ সনে একই কারণে অসমের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে বজালীতে কৃষক বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিল।’

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন