এই অধিবেশনে চন্দ্রপ্রভার ভূমিকা তাঁর নিজের জন্য তথা সমগ্র অসমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তেজপুরে এসে কিরণময়ী আগারওয়ালার সংস্পর্শে এসে মহিলা সমিতি গঠন, শিল্প স্থাপন ইত্যাদি কর্মের মধ্য দিয়ে চন্দ্রপ্রভার সাংগঠনিক দক্ষতা দেখে তেজপুরের জনগণ— বিশেষ করে সাহিত্য-সংস্কৃতি, দেশপ্রেমের ক্ষেত্রে সচেতন যুবশক্তি মুগ্ধ হয়েছিল বলা যেতে পারে। তাই ছাত্র সম্মেলনের সম্পাদক অমিয় কুমার দাস অধিবেশনে আফিম নিবারণের প্রস্তাব সমর্থন করে চন্দ্রপ্রভাকে ভাষণ দেওয়ার জন্য নির্বাচন করেছিলেন। চন্দ্রপ্রভা প্রস্তাব সমর্থন করে এমন একটি তেজস্বী যুক্তিপূর্ণ অথচ শ্রুতি মধুর দীর্ঘ ভাষণ দিলেন যে জনগণ তাঁর বক্তৃতায় মুগ্ধ হয়ে দীর্ঘ বক্তৃতা নীরবে শুনে গেল। চন্দ্রপ্রভার প্রশিক্ষণে স্বেচ্ছাসেবীদের কুচকাওয়াজ উপস্থিত দর্শক শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছিল। সভাপতি আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় যুবক-যুবতীদের এই ধরনের শৃঙ্খলাবদ্ধতাকে ভূয়সী প্রশংসা করলেন। চন্দ্রপ্রভার বক্তৃতায় দেশের প্রতি তাঁর প্রেম, প্রবল নিষ্ঠা এবং কর্মোদ্যমের পরিচয় ফুটে উঠেছিল।
সেই সময় অসমিয়া জনগণের দুটি গণ অনুষ্ঠান ছিল— অসম সাহিত্য সভা এবং অসম অ্যাসোসিয়েশন । অসম সাহিত্য সভা ১৯১৭ সনে শিবসাগরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই প্রতিষ্ঠানে সরকারি বেসরকারি চাকুরীজীবিদের ছাড়াও সমস্ত শ্রেণির জনগণ সহযোগিতা করেছিল। ১৯১৯ সনের ডিসেম্বর মাসে বরপেটায় অনুষ্ঠিত অধিবেশনে দু’জন মহিলা প্রতিনিধি যোগদান করেছিলেন। তারা হলেন রাজবালা দাস এবং চন্দ্রপ্রভা। এই সাহিত্য সভার মঞ্চ থেকে বরপেটার জনগণকে বিশেষ করে মায়েদের সম্বোধন করে চন্দ্রপ্রভা বলেছিলেন যে, মহাপুরুষ শংকরদেবের উদার ভাগবতী ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা করে পরস্পরের মধ্যে কোনো ধরনের ভেদাভেদ সৃষ্টি করা উচিত নয়। সমস্ত কুসংস্কার ত্যাগ করে তথাকথিত নিচু কুলের মানুষ এবং মায়েদের জন্য মন্দিরের দরজা খুলে দেওয়া উচিত। এখানে বলা যেতে পারে যে তখন পর্যন্ত চন্দ্রপ্রভা গান্ধিজির সাক্ষাৎ লাভ করেনি বা গান্ধিজির অস্পৃশ্যতা বর্জন নীতি সম্পর্কে ও তিনি সচেতন ছিলেন না। আসলে চন্দ্রপ্রভা জন্মগতভাবেই সমস্ত প্রকার বৈষম্যের বিরোধী ছিলেন।
১৯২১ সনের আগস্ট মাসে গান্ধিজি প্রথমবারের জন্য তেজপুর এসেছিলেন এবং আগরওয়ালা পরিবারের 'পকী'-তে বসবাস করেছিলেন। চন্দ্রপ্রভা গান্ধিজিকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ লাভ করেছিলেন। চন্দ্রপ্রভার ভাষায় গান্ধিজি মহিলাদের সম্বোধন করে বলেছিলেন— 'আমার বোনেরা, স্বরাজ আমাদের জন্মস্বত্ব। আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ হই, ব্রিটিশের সঙ্গে অসহযোগিতা করি, এক বছরের মধ্যে আমরা স্বরাজ লাভ করব।' গান্ধিজির বক্তব্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে চন্দ্রপ্রভা বলেছেন— ‘প্রতিটি শব্দ যেন অন্তরে তীরের মতো বিধঁল। সবাই যেন স্বরাজ মন্ত্রে দীক্ষিত হল।'
গান্ধিজির আন্দোলনের নীতি— বিশেষ করে স্বাধীনতা আন্দোলনে নারীরাও যে বিশেষ ভাবে সাহায্য করতে পারে খাদি এবং বস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে, এই কথা চন্দ্রপ্রভার মনে গভীর প্রভাব বিস্তার করে। তাই পরবর্তীকালে খাদি বস্ত্র উৎপাদন, সুতো কাটা ইত্যাদি পরিকল্পনা গ্রামগুলিতে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে চন্দ্রপ্রভা বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন।
গান্ধিজি যখন প্রথমবারের জন্য অসম এসেছিলেন তখন সমস্ত রাজ্য জুড়ে বিদেশি বস্ত্র বর্জনের কর্মসূচি চলছিল। গান্ধিজি যখন যেখানে গিয়েছেন, সেখানেই বিদেশী বস্ত্র দাহ বা 'বস্ত্রমেধ' যজ্ঞ সম্পন্ন করা হয়েছিল। তেজপুরের 'পকী'-তেও বস্ত্রমেধ যজ্ঞ গান্ধিজি নিজেই সম্পন্ন করেছিলেন। শোনা যায়, বিদেশি সুতো দিয়ে নিজের হাতে বোনা কাপড় চন্দ্রপ্রভা এই যজ্ঞে অর্পণ করেছিলেন। সেই জন্য জ্যোতিপ্রসাদ তাঁকে খদ্দরের কাপড় উপহার দিয়েছিলেন। এরপর থেকেই চন্দ্রপ্রভা খদ্দরের কাপড় পরতে শুরু করেন।
মহিলা সমিতি এবং ছাত্র সম্মেলনের সাংগঠনিক কাজ ছাড়াও তেজপুরে আসার পরে চন্দ্রপ্রভা সাহিত্য চর্চাতে ও মনোনিবেশ করেন। চন্দ্রপ্রভার প্রথম লেখা 'বাঁহী' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। চন্দ্রপ্রভা অসমিয়া ভাষায় দ্রুত এবং খুব সুন্দর লিখতে পারতেন। ছাত্রীদের রচনা লেখার ক্ষেত্রে মিশনারিরা খুব জোর দিতেন। আমেরিকান মিশনারিরা নিজেরাও অহরহ প্রতিবেদন এবং চিঠি লেখায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন। সমস্ত কাজের তন্নতন্ন খতিয়ান তুলে ধরে স্বদেশে নিয়মিত প্রতিবেদন এবং চিঠি লিখে পাঠানোর ক্ষেত্রে নিয়ম বড় কঠোর ছিল। ব্যাপ্টিস্ট মিশনারিরা শিবসাগর থেকে ১৮৬৪ সালে প্রকাশিত 'অরুণোদই' পত্রিকায় প্রথমবারের জন্য মহিলার লেখা প্রকাশ করেন। মিশনারিদের পত্নী কয়েকজন ছাড়াও অসমিয়া দুই এক জন ক্রিশ্চান মহিলা সংক্ষিপ্ত লেখা নিয়ে এই পত্রিকায় আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। 'অরুণোদই'-এর প্রকাশ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে জোরহাট থেকে 'দীপ্তি' নামে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের মহিলা বিদেশ মিশন সমাজ 'হেলপিং হ্যান্ড' নামে মহিলাদের কাজ সম্পর্কে লেখা একটি আলোচনা পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন। নগাঁও মিশনে ছত্রিশ বছর চাকরি করে কাটানো মিসেস পি এইচ মূর তার মিশন অভিজ্ঞতার ওপরে ভিত্তি করে ১৯০০-১৯১৬ সনের মধ্যে চারটি বই প্রকাশ করেন। অবশ্য চন্দ্রপ্রভার সঙ্গে মিসেস মূরের দেখা হয়নি। তাঁর স্বামী রেভারেন্ড পিট মূরের ১৯১৬ সালের মার্চ মাসে মৃত্যু হয়। শ্রীমতী মূরের শেষ বই 'স্ট্রে লিভস ফ্রম অসাম' ১৯১৬ সনে প্রকাশিত হয়। মিসেস মূর অন্য মিশনারি মহিলার মতো অসমিয়াতে বই লিখেছিলেন। ১৮৯০-৯২ সালের মধ্যে তিনি শিশুর জন্য লেখা 'লাইন আপন লাইন' নামে বাইবেলের একটি কাহিনি অসমিয়া ভাষায় অনুবাদ করেন। চন্দ্রপ্রভা স্কুল লাইব্রেরীতে 'অরুণোদই' এবং 'দীপ্তি' ও ব্যাপ্টিস্ট মিশনারি মহিলাদের লেখা এবং শিবসাগরের ব্যাপ্টিস্ট মিশনের ছাপা যন্ত্রে তখনকার দিনের বিরল অসমিয়া ভাষার বই পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। প্রথম অসমিয়া মহিলা লেখিকা পদ্মাবতী দেবী ফুকননীর বাল্যকাল এবং বিবাহিত জীবন নগাঁও শহরে অতিবাহিত হয়েছিল। মিশনারি মহিলারা বই লেখা ছাড়াও শিবসাগর এবং নগাঁওয়ের ভদ্রলোকদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে অন্তপুরের মহিলাদের হাতে বই তুলে দিয়েছিলেন। এভাবে আমেরিকান মিশনারিদের সৌজন্যে স্কুলের মুখ না দেখা, অন্তঃপুরে জীবন কাটানো অসমিয়া মহিলারা নিজের মাতৃভাষা অসমিয়া পড়তে এবং লেখার সুযোগ লাভ করেছিল। তেজপুরে চন্দ্রপ্রভা মাত্র কয়েক বছর ছিলেন। কিন্তু এই স্বল্প সময়ই চন্দ্রপ্রভার জীবন পাত্র এভাবে ঐশ্বর্যে ভরিয়ে তুলল যে সমগ্র জীবন জুড়ে তিনি সেই ঐশ্বর্যের সাগরে অবগাহন করে কাটালেন। অন্যদিকে প্রাচুর্যে ভরা দিনগুলিতে তাঁর জীবনে এমন একটি ঘটনা ঘটল যে এটা তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের গতিকে পরিবর্তিত করে দিল। তেজপুরে কর্মোদ্যমে উজ্জ্বল হয়ে থাকা সেই দিনগুলি ছেড়ে তিনি দৈশিঙরীতে ভবিষ্যতের আগত দিনগুলির জন্য মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি নিলেন। শুরু হল ত্যাগ এবং সংগ্রামের জীবন।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন