শনিবার, ২৪ জুলাই, ২০২১

আমাদের চন্দ্রপ্রভা শইকীয়ানী - ২ (বাসুদেব দাস)

 


রাতিরাম মজুমদার ও গঙ্গাপ্রিয়া দম্পতির আটজন কন্যাসন্তান এবং তিনজন পুত্রসন্তানের জন্ম হয়েছিল। সেই সময় জনগণের মধ্যে স্বাস্থ্য সম্পর্কে কোনো সচেতনতা ছিল না। তাই শৈশবেই অধিকাংশ শিশুর মৃত্যু হত। গঙ্গাপ্রিয়ার কয়েকটি সন্তানের শৈশবেই মৃত্যু হয়েছিল।  ১৮৫৬ সনে ডিব্রুগড়ে একটি মেয়েদের প্রাথমিক স্কুল স্থাপিত হয়। তবে প্রয়োজনের তুলনায় তা ছিল খুবই নগন্য। ১৯১৩ সনে ডিব্রুগড়ে স্থাপিত ‘মডেল স্কুল’-কে উন্নীত করে ১৯২৬ সনে সরকারি হাইস্কুলের রূপদান করা হয়। মিশনারিদের প্রতিষ্ঠিত স্কুলে কন্যাকে পাঠাতে অনেক অভিভাবকই রাজি ছিলেন না। উদারমনা এবং অভিজাত পরিবারের বেশিরভাগ মেয়েরাই বাড়িতে থেকেই পড়াশোনার চর্চা করতেন। শিক্ষার প্রতি চন্দ্রপ্রভার বিপুল আগ্রহ দেখে তাকে টিহুর কাছে ভালুকী গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হয়। সেখানে মাসির বাড়িতে থেকেই তিনি প্রাইমারি স্কুলের শেষ পরীক্ষায় সাফল্যের সঙ্গে পাশ করেন। এরপর কঠালমুরির ছেলেদের এম.ভি স্কুলে বোন রামেশ্বরীর সঙ্গে ভর্তি হন। বাড়ি থেকে স্কুলের দূরত্ব অনেকটা, দুর্গম রাস্তা ঘাট। বর্ষায় কোমর অব্দি জল-কাঁদা ভেঙ্গে স্কুলে যাওয়া আসা করতে হয়। মেয়েদের কষ্ট দেখে পিতা রাতিরাম নিজেদের গ্রামেই একটি স্কুল খোলার চেষ্টা করেন। এই কাজে তাকে সর্বতোভাবে সাহায্য করে ছোটমেয়ে চন্দ্রপ্রভা। বাড়ি বাড়ি গিয়ে মেয়েদের জোগাড় করে অনেক কষ্টে স্কুল খোলা হয়। স্কুলঘর বলতে চারটে খুটির ওপর একটি চালা। চেয়ার-টেবিল, বোর্ড বা চক পেন্সিল কিছুই নেই। তবু অদম্য উৎসাহের অধিকারিনী চন্দ্র প্রভা বিন্দুমাত্র নিরাশ হলেন না। মনপ্রাণ দিয়ে ছাত্রীদের পড়াতে লাগলেন। এই স্কুলই চন্দ্রপ্রভার জীবনের গতিপথ বদলে দিল। সেই সময় স্কুল পরিদর্শক ছিলেন স্বর্গীয় নীলকান্ত বরুয়া। কীভাবে যেন স্কুলটির খবর তাঁর কানে পৌছে গেল। নিতান্ত কৌতুহলের বশেই তিনি স্কুলটি পরিদর্শন করতে এলেন। দুই বোনের অমিত সাহস,কষ্টসহিষ্ণুতা এবং বিদ্যার প্রতি অপরিসীম আগ্রহ দেখে শ্রীবরুয়া মুগ্ধ হলেন। তিনি দুই বোনেরই নগাঁও মিশনারি স্কুলের হোস্টেলে থেকে পড়ার ব্যবস্থা এবং বৃত্তির ব্যবস্থা করে দেন।

        উনিশ শতকে কয়েকজন বিশিষ্ট অসমিয়া কর্মসূত্রে  নগাঁওয়ের বাসিন্দা হন। তাদের মধ্যে আনন্দরাম ঢেকিয়াল ফুকন, বলিনারায়ণ বড়া এবং রায়বাহাদুর গুণাভিরাম বরুয়া অন্যতম। শ্রীমন্ত শংকরদেবের জন্ম স্থান বরদোয়ার নিকটবর্তী নগাঁও প্রথম থেকেই সত্রীয়া পরম্পরার একটি প্রধান কেন্দ্রস্থল বলে বিবেচিত হয়ে আসছিল। উনিশ শতকে  হিন্দু-মুসলমান, ব্রাহ্মধর্ম, সংস্কৃতির প্রভাবে নগাঁও শহর একটি বৈচিত্র্যপূর্ণ সার্বজনীন চরিত্র ধারণ করেছিল

        ১৮৪১ সনে আমেরিকান ব্যাপ্টিস্ট মিশনের ডক্টর মাইলস ব্রসন নগাঁও শহরে  ধর্ম প্রচারের জন্য একটি কেন্দ্র স্থাপন করেন। রেভারেন্ড মাইলস ব্রনসন নঁগাও শহরে এসে  কাজ শুরু করেন। নগাঁও আসার কিছুদিনের মধ্যে ১৮৪৩ সনে পত্নী রুথ ব্রনসনের সহযোগিতায় একটি আবাসিক স্কুল স্থাপন করেন। শুরুতে স্কুলটির প্রায় সমস্ত ছাত্র-ছাত্রী অনাথ ছিল বলে স্কুলটির নাম দেওয়া হয় নগাঁও অর্ফান ইনস্টিটিউট। ডক্টর ব্রসন স্থাপন করা স্কুলটি কিছুটা ব্যতিক্রমী ছিল। এটি ছিল  আবাসিক স্কুল এবং এতে ছেলে-মেয়েদের আলাদা শাখা ছিল। নগাঁও আসার আগে ব্রনসন দম্পতি নাগা পাহাড়ে একটি ছেলেদের স্কুল স্থাপন করেছিলেন। ডক্টর ব্রনসনের  পরিকল্পনা অনুসারে নগাঁওয়ের  স্কুলটি একটি আদর্শ স্কুলে পরিণত হয়েছিল। এর শিক্ষা পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। ডক্টর ব্রনসন আশা করেছিলেন যে  স্কুলটিতে পড়াশোনা করা ছাত্র-ছাত্রীরা ভবিষ্যতে একটি অসমিয়া খ্রিস্টান সমাজ গঠন করতে সক্ষম হবে। তার আশা বিফল হয়নি। এই স্কুলের কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রী একটা সময়ে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করে এবং তার আশেপাশে পাহাড়ে খ্রিস্টান ধর্ম প্রচারের কাজে মিশনারিদের বিশেষ সহায়ক হয়ে উঠেছিল। স্কুলটির গতি একদিন স্তিমিত  হয়ে আসে। শ্রীমতি ব্রনসন অসুস্থতার জন্য আমেরিকায় ফিরে গেলে সেখানেই তার মৃত্যু হয়। মেয়েদের আবাসটি দেখাশোনা করার জন্য কলকাতা থেকে একজন খ্রিষ্টান বিধবাকে ম্যাট্রন হিসেবে আনা হয়। কিন্তু তাতেও সবদিক রক্ষা পায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের মিশন কর্তৃপক্ষ ডক্টর ব্রনসনের মতো একজন দক্ষ ধর্মপ্রচারককে ধর্ম প্রচারের ক্ষেত্রে পুরোপুরি মন না দিয়ে স্কুল পরিচালনার কাজে আবদ্ধ হয়ে থাকাটা পছন্দ করেনি। অবশেষে ব্যাপ্টিস্ট মিশন বোর্ড  ১৮৫৫ সনে  নগাঁও অরফ্যান ইনস্টিটিউট বন্ধ করে দেয়

         ১৮৭৫ সালে মিশনারি স্কুলের পুনর্জন্ম হয়। এটি মেয়েদের আবাসিক স্কুল হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। প্রথম অবস্থায় স্কুলটির গতি ছিল অত্যন্ত মন্থর। ১৮৮০ সনে  স্কুলে মাত্র কুড়ি জন ছাত্রী ছিল। মেয়েদেরও পড়াশোনার কোনো আগ্রহ ছিল না। পিতা-মাতারা ছিলেন মেয়েদের শিক্ষার প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন। নিজের মেয়েকে স্কুলে পাঠানোর বিন্দুমাত্র চেষ্টা করতেন না। নারীরা দলবেঁধে হিন্দু-মুসলমানের বাড়ি বাড়ি গিয়ে মায়েদের মেয়েকে স্কুলে পাঠাবার জন্য অনুরোধ করতেন। ১৮৮৫ সালে স্কুলের ছাত্রী সংখ্যা ছিল মাত্র তেইশ জন

        ১৮৮১ সনে শিকাগো শহরে মিশনারিদের প্রশিক্ষণ দেবার জন্য ব্যাপটিস্ট মিশন ট্রেনিং স্কুল(বি এম টিএস) স্থাপন করে। অসম ব্যাপ্টিস্ট মিশনে  কাজ করা অনেক মহিলা মিশনারি এই স্কুলে প্রশিক্ষণ লাভ করেছিল। কুড়ি শতকের প্রথম দিকে নগাঁও মিশন স্কুলে শিক্ষকতার জন্য আসা মহিলা মিশনারীরা কলেজের স্নাতক হওয়া ছাড়াও বি.এম.টি.এস. প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত মিশনারি ছিলেন। এই উচ্চশিক্ষিত এবং নিষ্ঠাবান মহিলা মিশনারীদের তত্ত্বাবধানে কুড়ি শতকের প্রথম দুটি দশকের মধ্যে নগাঁও মিশন বালিকা বিদ্যালয়টি (নগাঁও মিশন ছোঁৱালী স্কুল) সমগ্র অসমের মধ্যে স্ত্রীশিক্ষার এক উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিল। নগাঁও মিশন স্কুলে সমস্ত পর্যায়ের শিক্ষাদান অসমিয়া ভাষার মাধ্যমে করা হত। আমেরিকান ব্যাপ্টিস্ট মিশনারিরা উনিশ শতকে অসমিয়া ভাষার এক সংকটকালে মাতৃভাষার পুনরুদ্ধার এবং রাজ্য ভাষা হিসাবে এর সংস্থাপনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিল। (চলবে)

 

প্রথম পর্ব

 

তৃতীয় পর্ব 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আমাদের চন্দ্রপ্রভা শইকীয়ানী - ৭ (বাসুদেব দাস)

  অতুলের জন্মের পর থেকে দণ্ডিনাথ কলিতা চন্দ্রপ্রভাকে মাসে দশ টাকা করে পাঠাতেন । এই ১০   টাকা দিয়েই মা ছেলেকে সারা মাস চালাতে হত। সেই সময় ...