বৃহস্পতিবার, ২৯ জুলাই, ২০২১

আমাদের চন্দ্রপ্রভা শইকীয়ানী - ৫ (বাসুদেব দাস)

 


তেজপুরের ছাত্র সম্মেলনেই চন্দ্রপ্রভার সঙ্গে পরিচয় হয় তেজপুরের একজন প্রতিভাশালী উদীয়মান যুবক দণ্ডিনাথ কলিতার সঙ্গে। কলিতা শিক্ষিত এবং গান্ধিজির আদর্শের অনুগামী। তিনি ছিলেন বৃত্তিতে শিক্ষক। চন্দ্রপ্রভাও এই সদগুণের অধিকারিনী ছিলেন। তাই এই দুই মেধা, ব্যক্তিত্ব, একই বৃত্তি এবং সর্বোপরি একই আদর্শের অনুগামী যুবক যুবতি পরস্পর পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট হলেন। তেজপুরের প্রতিভাশালী, উদীয়মান যুবক দণ্ডিনাথের বিষয়ে চন্দ্রপ্রভা হয়তো বিভিন্ন লোকমুখে শুনেছেন। বিশেষ করে তেজপুরের মহিলা সমিতি কিভাবে দুঃখী ছাত্রদের আর্থিক সাহায্য করতেন সেই সম্পর্কে চন্দ্রপ্রভা সচেতন ছিলেন। তিনি এটাও শুনেছিলেন যে দণ্ডিনাথ মহিলা সমিতির সাহায্য নিয়ে পড়াশোনা করছিলেন। দণ্ডিনাথের বিষয়ে শুনে শুনে প্রত্যক্ষ সাক্ষাৎ না ঘটলেও দণ্ডিনাথ হয়তো চন্দ্রপ্রভার কাছে অনেকটাই পরিচিতের মতো হয়ে পড়েছিলেন। হয়তো চন্দ্রপ্রভার মানস পটে থাকা আদর্শ পুরুষের ছবি হিসেবে দণ্ডিনাথের মধ্যেই নিজের দয়িতকে খুঁজে পেয়েছিলেন। তেজপুর বালিকা ছাত্রবৃত্তি স্কুলের চৌহদে প্রধান শিক্ষয়িত্রী চন্দ্রপ্রভা বাস করতেন। কাছেই দণ্ডিনাথ কলিতার বাসগৃহ। কলিতা তখন অবিবাহিত, ত্রিশ বছরের সফল যুবক। ছেলেদের স্কুলের শিক্ষক। কলিতা চন্দ্রপ্রভা থেকে বয়সে বড়। সাহিত্যিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। দুজনেই একে অপরের দ্বারা উপকৃত হয়েছিলেন। কলিতা চন্দ্রপ্রভার স্কুলের ছাত্রীদের অনুষ্ঠানে পরিবেশন করার জন্য গান রচনা করে দিয়েছিলেন। চন্দ্রপ্রভার লেখা ‘বাঁহী’ পত্রিকায় প্রকাশের ব্যাপারেও দণ্ডিনাথ কলিতার যথেষ্ট ভূমিকা ছিল।

        যুগে যুগে প্রতিভা প্রতিভাকে আকর্ষণ করে এসেছে, কখনও হয়তো স্বর্গীয় প্রেম রূপে, কখনও মোহরূপে। রক্ষণশীল সমাজ পবিত্র প্রেমকে কখনও স্বীকৃতি দান করে না। স্বাভাবিক ভাবেই দুইজনের সম্পর্ক একদিন প্রেমে পরিণতি লাভ করে। সম্বন্ধ গভীরতায় পরিণত হয়ে চন্দ্রপ্রভা অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। কলিতার পরিবার চন্দ্রপ্রভাকে পুত্রবধূ হিসেবে গ্রহণ করতে অস্বীকার করে। তাদের মতে দণ্ডিনাথের পরিবারের তুলনায় চন্দ্রপ্রভার পরিবার নিচু জাতের। দণ্ডিনাথও চন্দ্রপ্রভাকে স্ত্রী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে। বাড়ির বড় ছেলে এবং একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলে হয়ে পিতা-মাতার মতের বিরুদ্ধে গিয়ে চন্দ্রপ্রভাকে বিয়ে করার সাহস জোগাড় করতে পারেন না। চন্দ্রপ্রভা তেজপুরের চাকরি ছেড়ে পিতৃগৃহে ফিরে যান। এই ঘটনা দুজনেরই ব্যক্তিজীবনে তুফানের সৃষ্টি করে এবং প্রেম, বিবাহ এবং নারী অধিকার সম্বন্ধে তৎকালীন সমাজে নানা প্রশ্ন উত্থাপিত হয়।

        চন্দ্রপ্রভা-দণ্ডিনাথের মাঝখানকার প্রেমের সম্বন্ধ এবং বিশেষ করে তাঁর অসফল পরিণতি ‘স্ত্রীশিক্ষা’ বা ‘নারী স্বাধীনতা’-র ক্ষেত্রে সমাজের দুমুখো মনোভাবকে প্রকট করে তোলে। যুক্তি বা আদর্শের স্তরে পুরুষের সঙ্গে নারীর সমতা স্বীকার করে নিলেও— রাজনৈতিক, সামাজিক ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণকে স্বাগত জানালেও— পুরুষ নারীর ব্যক্তিগত সম্পর্কে সমাজের বিচার-বিধান যে সেই অচলায়তনের নাগপাশেই আজও বাঁধা পড়ে আছে— তা একেবারে পরিষ্কার হয়ে গেল। অসমে গান্ধির অসহযোগ আন্দোলনের অন্যতম প্রবর্তক চন্দ্রনাথ শর্মার অন্তরঙ্গ বন্ধু এবং তাঁর সঙ্গে অসমের গ্রামেগঞ্জে সমাজ সংস্কারের কাজে ঘুরে বেড়ানো সহকর্মী দণ্ডিনাথ কলিতাও সমাজ সংস্কারের কাজে ব্রতী ছিলেন। ছাত্রাবস্থা থেকেই তিনি ব্যঙ্গ কবিতা লিখে অস্পৃশ্যতা, বাল্যবিবাহ, জাতপাতের বিচার ইত্যাদি সমাজের জন্য ক্ষতিকর প্রথার অপকারিতা সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করে দিয়েছিলেন। সামাজিক বিষয়ে উদার হলেও দণ্ডিনাথ কলিতা নারীর বিষয়ে বা পুরুষ নারীর সম্বন্ধের বিষয়ে নিজেকে সমাজের পুরোনো সংস্কার থেকে মুক্ত করে নিতে পারেনি। গ্রামের দুঃখী কিন্তু সংস্কৃতিবান পরিবারের সন্তান কলিতা কটন কলেজে আধুনিক শিক্ষা লাভ করেও নারী-পুরুষের সম্বন্ধে সমাজে প্রচলিত ধারণা থেকে মুক্ত হতে পারেন নি।

        চন্দ্রপ্রভার মতো রাজনীতিতে দণ্ডিনাথ কলিতার বিশেষ আগ্রহ ছিল না। তিনি ছিলেন মূলত সাহিত্যিক। তেজপুরে গান্ধিবাদী আন্দোলনের জোয়ার আনার মূলে ছিলেন কলিতার অন্তরঙ্গ বন্ধু চন্দ্রনাথ শর্মা। একদিকে চন্দ্রনাথ শর্মা দেখানো আদর্শ, অন্যদিকে চন্দ্রপ্রভার উৎসাহ কলিতাকেও সাময়িকভাবে গান্ধিবাদী হয়ে উঠতে উৎসাহ জুগিয়েছিল। তেজপুরের যুবকদের মন পুলকিত করা এই ঘটনাবলী চন্দ্রপ্রভা কলিতার সম্বন্ধ গাঢ় এবং তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলা ছাড়াও অধিক জটিল এবং সমস্যা জর্জরিত করে তুলেছিল। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে মহাত্মা গান্ধির ভূমিকা অনন্স্বীকার্য হলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাঁর চিন্তা দ্ব্যর্থব্যঞ্জনা থেকে মুক্ত নয়। বিশেষ করে চন্দ্রপ্রভা গ্রহণ করা দুটি বিষয়ে— নারীর স্বাধীনতা এবং অস্পৃশ্যতা বর্জন বনাম জাত পাত বিচারের বৈধতা— এই দুটি বিষয় হয়ে উঠল দণ্ডিনাথ কলিতা এবং চন্দ্রপ্রভার জীবনের বিভেদের মূল কারণ।

        দেশের সমস্ত শক্তি একত্রিত করার জন্য গান্ধিজি রাজনৈতিক বিপ্লবকে সামাজিক বিপ্লবের রূপ দান করেছিলেন। আর দশটি বিপ্লবের মতোই সমাজের শোষিত, দলিতকে মুক্তির স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল। নারীমুক্তির ধারণা ফরাসি বিপ্লবে প্রথম প্রকাশ পায়, পরে রুশ বিপ্লবেও তা উচ্চারিত হয়। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে দেশের জনসাধারণের সঙ্গে অনুন্নত শ্রেণি এবং নারীরাও মুক্তির স্বপ্ন দেখেছিল। গান্ধিজির আহ্বানে সম্ভ্রান্ত এবং সাধারণ ঘরের নারী রাজপথে বেরিয়ে এসেছিল। স্ত্রীশিক্ষা, বাল্যবিবাহ, বিধবার পুনর্বিবাহ আদি সংস্কারমূলক চিন্তা উচ্চারিত হয়েছিল। চন্দ্রপ্রভার মতো নারীবাদী চিন্তায় উদ্বুব্ধ শিক্ষিতা নারী গান্ধিজির নারীর অধিকার সম্পর্কীয় প্রস্তাবে সম্পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছিল। যৌবনের উৎসাহে ভাসতে থাকা আশাবাদী চন্দ্রপ্রভার সমাজের কঠোরতা সম্পর্কে  কোনো ধারণা ছিল না। সে ভেবেছিল পুরোনো সংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কলিতাকে সহযোদ্ধা হিসেবে লাভ করবে। প্রথমদিকে দণ্ডিনাথ কলিতাও চন্দ্রপ্রভা তেজস্বী ভাষায় তুলে ধরা যুক্তির প্রতি সায় দিয়েছিলেন বলে মনে হয়। সেইসময় কলিতার ‘বাঁহী’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি বিশেষ ছোটগল্প ‘সধবা নে বিধবা নে কুমারী?’ পড়লে এমনটাই মনে হয়। 

        গল্পের নায়িকা প্রতিমাকে সমাজ থেকে এই প্রশ্নটি শুনতে হওয়ায় সে বাল্যবিবাহের অযৌক্তিকতা এভাবে ব্যাখ্যা করে— ‘যেখানে প্রেমের কণিকা মাত্র নেই, যেখানে বয়সের মিল পর্যন্ত পাওয়া যায় না, যা কী জিনিস আমি বুঝতেই পারিনি, তার জন্য জীবন বলি দেওয়া নির্বোধ ছাড়া অন্য কারও কাজ হতে পারে না।প্রতিমা বাল্যকালে বিয়ে হয়ে পরিণত হওয়ায় স্বামীকে প্রত্যাখান করে— স্বামী জীবিত না মৃত কোনো খবর করেনি— তাই সধবা না বিধবা জানে না— যদিও নিজের চোখে সে কুমারী হয়েই আছে। এটা যে চন্দ্রপ্রভার ভাষা তাতে কোনো সন্দেহ নেই কারণ, নায়িকা প্রতিমাকে গল্পকার বর্ণনা করেছেন এভাবে— ‘প্রতিমা শিক্ষিত, সে লেখাপড়া জানে, সেলাই জানে, রান্নাবান্না জানে, গান-বাজনাও জানে। এমনকি নির্ভীকভাবে যার তার সঙ্গে কথা বলতে জানে, সভা সমিতিতে যোগদান করে এবং রাজনীতি সমাজনীতির আলোচনাও করে।’ চন্দ্রপ্রভা ছাড়া তখনকার তেজপুরে কেন, সমগ্র অসমেই এই ধরনের আর দ্বিতীয় কোনো নারী চরিত্র ছিল কি? এটাই শেষ নয়, হুবহু এই একই যুক্তি পরবর্তীকালে চন্দ্রপ্রভা শইকীয়ানী রচিত ‘দৈবজ্ঞ দুহিতা’ গল্পের নায়িকা মেনকার মুখেও আমরা দেখতে পাই।

আমাদের চন্দ্রপ্রভা শইকীয়ানী - ৪ (বাসুদেব দাস)

 

         এই অধিবেশনে চন্দ্রপ্রভার ভূমিকা তাঁর নিজের জন্য তথা সমগ্র অসমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তেজপুরে এসে কিরণময়ী  আগারওয়ালার সংস্পর্শে এসে মহিলা সমিতি গঠন, শিল্প স্থাপন ইত্যাদি কর্মের মধ্য দিয়ে চন্দ্রপ্রভার সাংগঠনিক দক্ষতা দেখে তেজপুরের জনগণ— বিশেষ করে সাহিত্য-সংস্কৃতি, দেশপ্রেমের ক্ষেত্রে সচেতন যুবশক্তি মুগ্ধ হয়েছিল বলা যেতে পারে। তাই ছাত্র সম্মেলনের সম্পাদক অমিয় কুমার দাস অধিবেশনে আফি নিবারণের প্রস্তাব সমর্থন করে চন্দ্রপ্রভাকে ভাষণ দেওয়ার জন্য নির্বাচন করেছিলেন চন্দ্রপ্রভা প্রস্তাব সমর্থন করে এমন একটি তেজস্বী যুক্তিপূর্ণ অথচ শ্রুতি মধুর দীর্ঘ ভাষণ দিলেন যে জনগণ তাঁর বক্তৃতায় মুগ্ধ হয়ে দীর্ঘ বক্তৃতা নীরবে শুনে গেল চন্দ্রপ্রভার প্রশিক্ষণে স্বেচ্ছাসেবীদের কুচকাওয়াজ উপস্থিত দর্শক শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছিল সভাপতি আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় যুবক-যুবতীদের এই ধরনের শৃঙ্খলাবদ্ধতাকে ভূয়সী প্রশংসা করলেন। চন্দ্রপ্রভার বক্তৃতায় দেশের প্রতি তাঁর প্রেম, প্রবল নিষ্ঠা এবং কর্মোদ্যমের  পরিচয় ফুটে উঠেছিল।

        সেই সময় অসমিয়া জনগণের দুটি গণ অনুষ্ঠান ছিল— অসম সাহিত্য সভা এবং অসম অ্যাসোসিয়েশন । অসম সাহিত্য সভা ১৯১৭ সনে শিবসাগরে  প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই প্রতিষ্ঠানে সরকারি বেসরকারি চাকুরীজীবিদের ছাড়াও সমস্ত শ্রেণির জনগণ সহযোগিতা করেছিল। ১৯১৯ সনের ডিসেম্বর মাসে বরপেটায় অনুষ্ঠিত অধিবেশনে দুজন মহিলা প্রতিনিধি যোগদান করেছিলেন তারা হলেন রাজবালা দাস এবং চন্দ্রপ্রভা। এই সাহিত্য সভার মঞ্চ থেকে বরপেটার জনগণকে বিশেষ করে মায়েদের সম্বোধন করে চন্দ্রপ্রভা বলেছিলেন যে, মহাপুরুষ শংকরদেবের উদার ভাগবতী ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা করে পরস্পরের মধ্যে কোনো ধরনের ভেদাভেদ সৃষ্টি করা উচিত নয়। সমস্ত কুসংস্কার ত্যাগ করে তথাকথিত নিচু কুলের মানুষ এবং মায়েদের জন্য মন্দিরের দরজা খুলে দেওয়া উচিত। এখানে বলা যেতে পারে যে তখন পর্যন্ত চন্দ্রপ্রভা গান্ধিজির সাক্ষাৎ লাভ করেনি বা গান্ধিজির অস্পৃশ্যতা বর্জন নীতি সম্পর্কে ও তিনি সচেতন ছিলেন না। আসলে চন্দ্রপ্রভা জন্মগতভাবেই সমস্ত প্রকার বৈষম্যের বিরোধী ছিলেন।

        ১৯২১ সনের আগস্ট মাসে গান্ধিজি প্রথমবারের জন্য তেজপুর এসেছিলেন এবং আগরওয়ালা পরিবারের 'পকী'-তে বসবাস করেছিলেন। চন্দ্রপ্রভা গান্ধিজিকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ লাভ করেছিলেন। চন্দ্রপ্রভার ভাষায় গান্ধিজি মহিলাদের সম্বোধন করে বলেছিলেন— 'আমার বোনেরা, স্বরাজ আমাদের জন্মস্বত্ব। আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ হই, ব্রিটিশের সঙ্গে অসহযোগিতা করি, এক বছরের মধ্যে আমরা স্বরাজ লাভ করব।' গান্ধিজির বক্তব্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে চন্দ্রপ্রভা বলেছেন—  প্রতিটি শব্দ যেন অন্তরে তীরের মতো বিধঁল। সবাই যেন স্বরাজ মন্ত্রে দীক্ষিত হল।'

        গান্ধিজির আন্দোলনের নীতি—  বিশেষ  করে স্বাধীনতা আন্দোলনে নারীরাও যে বিশেষ ভাবে সাহায্য করতে পারে খাদি এবং বস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে, এই কথা চন্দ্রপ্রভার মনে গভীর প্রভাব বিস্তার করে। তাই পরবর্তীকালে খাদিস্ত্র উৎপাদন, সুতো কাটা ইত্যাদি পরিকল্পনা গ্রামগুলিতে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে চন্দ্রপ্রভা বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন।

        গান্ধিজি যখন প্রথমবারের জন্য অসম এসেছিলেন তখন সমস্ত রাজ্য জুড়ে বিদেশি বস্ত্র বর্জনের কর্মসূচি চলছিল। গান্ধিজি যখন যেখানে গিয়েছেন, সেখানেই বিদেশী বস্ত্র  দাহ বা 'বস্ত্রমেধ' যজ্ঞ   সম্পন্ন করা হয়েছিল। তেজপুরের 'পকী'-তেও বস্ত্রমেধ যজ্ঞ গান্ধিজি নিজেই সম্পন্ন করেছিলেন। শোনা যায়, বিদেশি সুতো দিয়ে নিজের হাতে বোনা কাপড় চন্দ্রপ্রভা এই যজ্ঞে অর্পণ করেছিলেন। সেই জন্য জ্যোতিপ্রসাদ তাঁকে খদ্দরের কাপড় উপহার দিয়েছিলেন। এরপর থেকেই চন্দ্রপ্রভা খদ্দরের কাপড় পরতে শুরু করেন।

        মহিলা সমিতি এবং ছাত্র সম্মেলনের সাংগঠনিক কাজ ছাড়াও তেজপুরে আসার পরে চন্দ্রপ্রভা সাহিত্য চর্চাতে ও মনোনিবেশ করেন।  চন্দ্রপ্রভার প্রথম লেখা 'বাঁহী' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। চন্দ্রপ্রভা অসমিয়া ভাষায় দ্রুত এবং খুব সুন্দর লিখতে পারতেন। ছাত্রীদের রচনা লেখার ক্ষেত্রে মিশনারিরা খুব জোর দিতেন। আমেরিকান মিশনারিরা নিজেরাও অহরহ প্রতিবেদন এবং চিঠি লেখায় সিদ্ধহস্ত ছিলেনসমস্ত কাজের তন্নতন্ন খতিয়ান তুলে ধরে স্বদেশে নিয়মিত প্রতিবেদন এবং চিঠি লিখে পাঠানোর ক্ষেত্রে নিয়ম বড় কঠোর ছিল। ব্যাপ্টিস্ট মিশনারিরা  শিবসাগর থেকে ১৮৬৪ সালে প্রকাশিত 'অরুণোদ' পত্রিকায় প্রথমবারের জন্য মহিলার লেখা প্রকাশ করেন। মিশনারিদের পত্নী কয়েকজন ছাড়াও অসমিয়া দুই এক জন ক্রিশ্চান মহিলা সংক্ষিপ্ত লেখা নিয়ে এই পত্রিকায় আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। 'অরুণোদ'-এর  প্রকাশ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে  জোরহাট থেকে  'দীপ্তি' নামে  একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের মহিলা বিদেশ মিশন সমাজ 'হেলপিং হ্যান্ড' নামে  মহিলাদের কাজ সম্পর্কে  লেখা একটি আলোচনা পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন।  নগাঁও মিশনে ছত্রিশ বছর চাকরি করে কাটানো মিসেস পি এইচ  মূর  তার মিশন অভিজ্ঞতার ওপরে  ভিত্তি করে  ১৯০০-১৯১৬  সনের মধ্যে  চারটি বই প্রকাশ করেন। অবশ্য চন্দ্রপ্রভার সঙ্গে মিসেস মূরের দেখা হয়নি। তাঁর স্বামী রেভারেন্ড পিট মূরের ১৯১৬  সালের মার্চ মাসে মৃত্যু হয়। শ্রীমতী মূরের শেষ বই 'স্ট্রে লিভস ফ্রম অসাম' ১৯১৬ সনে প্রকাশিত হয়। মিসেস মূর অন্য  মিশনারি মহিলার মতো  অসমিয়াতে বই লিখেছিলেন। ১৮৯০-৯২ সালের মধ্যে  তিনি শিশুর জন্য লেখা  'লাইন আপন লাইন' নামে বাইবেলের একটি কাহিনি অসমিয়া ভাষায় অনুবাদ করেন। চন্দ্রপ্রভা স্কুল লাইব্রেরীতে 'অরুণোদই' এবং 'দীপ্তি' ব্যাপ্টিস্ট মিশনারি মহিলাদের লেখা  এবং শিবসাগরের  ব্যাপ্টিস্ট মিশনের  ছাপা যন্ত্রে  তখনকার দিনের বিরল অসমিয়া ভাষার বই পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। প্রথম অসমিয়া মহিলা লেখিকা পদ্মাবতী দেবী ফুকননীর বাল্যকাল এবং বিবাহিত জীবন নগাঁও শহরে অতিবাহিত হয়েছিল। মিশনারি মহিলারা বই লেখা ছাড়াও শিবসাগর এবং নগাঁওয়ের ভদ্রলোকদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে অন্তপুরের মহিলাদের হাতে বই তুলে দিয়েছিলেন। এভাবে আমেরিকান মিশনারিদের সৌজন্যে স্কুলের মুখ না দেখা, অন্তঃপুরে জীবন কাটানো অসমিয়া মহিলারা  নিজের মাতৃভাষা অসমিয়া পড়তে এবং লেখার সুযোগ লাভ করেছিল। তেজপুরে চন্দ্রপ্রভা মাত্র কয়েক বছর ছিলেন। কিন্তু এই স্বল্প সময়ই চন্দ্রপ্রভার জীবন পাত্র এভাবে ঐশ্বর্যে ভরিয়ে তুলল যে সমগ্র জীবন জুড়ে তিনি সেই ঐশ্বর্যের সাগরে অবগাহন করে কাটালেন। অন্যদিকে প্রাচুর্যে ভরা দিনগুলিতে তাঁর জীবনে এমন একটি ঘটনা ঘটল যে এটা তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের গতিকে পরিবর্তিত করে দিল তেজপুরে কর্মোদ‍্যমে উজ্জ্বল হয়ে থাকা সেই দিনগুলি ছেড়ে তিনি দৈশিঙরীতে ভবিষ্যতের আগত দিনগুলির জন্য মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি নিলেন। শুরু হল ত্যাগ এবং সংগ্রামের জীবন।

 

 

বুধবার, ২৮ জুলাই, ২০২১

আমাদের চন্দ্রপ্রভা শইকীয়ানী - ৩ (বাসুদেব দাস)

 



মিশন স্কুলে ছাত্রী হিসেবে ভর্তি হওয়ার পরে চন্দ্রপ্রভা এবং তাঁর বোন রজনীপ্রভার জীবনে কিছু অভাবনীয় পরিবর্তন এল। স্কুলের পরিবেশ গ্রামের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। পারিপার্শ্বিকতার কথা তো বাদই, গ্রামের পঙ্কিলতা এবং বিশৃঙ্খলার পরিবর্তে কেবল শৃঙ্খলা এবং পারিপাট্য। বিশাল বিশাল সব শ্রেণিকক্ষ। ঘণ্টা, মিনিট অনুসরণ করে কর্মসূচি। চারপাশে শৃঙ্খলা এবং নিয়মানুবর্তিতা বিরাজমান। নিয়াই পন্ডিত নামে একজন অসমিয়া শিক্ষক ছাড়া বাকিরা সবাই ছিলেন মহিলা শিক্ষয়িত্রী। মিশনারি কয়েকজনকে সাহায্য করতেন কলকাতা থেকে আগত মিশন স্কুলের শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ নিয়ে আসা কয়েকজন অসমিয়া শিক্ষয়িত্রী। প্রথমেই দুই বোনের নাম পরিবর্তিত হয়েছিল। দুই বোন চন্দ্রপ্রিয়া এবং রামেশ্বরীর নাম পরিবর্তিত হয়ে যথাক্রমে চন্দ্রপ্রভা এবং রজনীপ্রভা হল। নামের মধ্যে আধুনিকতার পরিচয় রয়েছে। নাম ছাড়াও দুই বোনের সাজপোশাকেও পরিবর্তন দেখা গেল। ব্রিটিশ রাজশক্তির অসমে আগমনের পরে অন্যান্য পরিবর্তনের সঙ্গে অসমিয়া মহিলাদের পারম্পরিক রিহা, মেখেলা এবং চাদর পরার মধ্যেও কিছুটা সংশোধন দেখা গেল। ব্লাউজ  বা  সেমিজ, পেটিকোট পরার নিয়ম আগে ছিল না। এখন এইসব অসমিয়া মহিলাদের পরিধানের অংশ হল। জীবনের গতিশীলতায় অনেক পরিবর্তন এল। নিয়মানুবর্তিতা  এবং অনুশাসন স্কুলটিতে অন্যতম গুণ বলে মনে করা হত। মিশনারিদের, স্কুলের ছাত্রী, শিক্ষয়িত্রী, কর্মচারীদের কাজকর্ম ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে করতে হত। ঘুম থেকে উঠার পর থেকে রাতের বেলা বিছানায় যাওয়া পর্যন্ত প্রত্যেককেই নিজের কর্তব্য পরিচ্ছন্নভাবে পালন করতে হত। প্রায় রবিবারেই বাইবেলের শিক্ষয়িত্রী শ্রীমতী লঙ ছাত্রীদের নিয়ে স্কুলের সীমানার বাইরে বেড়াতে যেতেন। কিশোরী চন্দ্রপ্রভা সবুজে ঘেরা নগাওঁয়ের ছোট-বড় পাহাড়, বিভিন্ন ফুলের সুবাস, নানা ধরনের পাখির কাকলি সমৃদ্ধ প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় একাত্মতা অনুভব করতেন। কখনও  কখনও ছাত্রীদের নিয়ে কলং নদীর পারে নিয়ে যাওয়া হত।

চন্দ্রপ্রভা এবং রজনীপ্রভা দুই বোনই পড়াশোনার প্রতি অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন। গ্রামের সংকীর্ণ পরিবেশ থেকে এসে নগাঁও শহরে উপযুক্ত শিক্ষার পরিবেশ পেয়েছেন। মিশনারি স্কুলের শিক্ষয়িত্রীরা সাত সাগর তের নদী পার হয়ে এই দেশের মেয়েদের মধ্যে শিক্ষার আলোক বিতরণ করার জন্য প্রাণপনে চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তাই চন্দ্রপ্রভা মনে মনে সংকল্প করেন ভবিষ্যতে নারীদের শিক্ষার জন্য কিছু একটা করতে হবে। চন্দ্রপ্রভার রক্তে নিহিত হয়ে থাকা চিন্তার প্রথম প্রতিফলন  ঘটে ছিল এই মিশন স্কুলেই। 

১৯১৭ সনে চন্দ্রপ্রভা নগাঁও মিশন স্কুল থেকে ইংরেজি মাইনর (M.E.) পাস করে বেরিয়ে এসেই নগাঁও বালিকা বিদ্যালয়ের  প্রাইমারি বিভাগে শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন। এখানে তিনি কয়েক মাস ছিলেন। এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই তিনি নগাঁও শহরের মুখ্য মহিলাদের নিয়ে নগাঁও মহিলা সমিতি নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। খগেন্দ্রীপ্রিয়া বরুয়াকে সভানেত্রী এবং স্বর্ণলতা বরুয়াকে সম্পাদিকার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তখন চন্দ্রপ্রভা ষোলো বছরের যুবতী মাত্র। চন্দ্রপ্রভা বিশ্বাস করতেন যে মহিলারা একত্রিত হয়ে যদি সমিতি স্থাপন করে, সাহিত্যচর্চা ও করে তাহলে নারী-জীবনের অনেকখানি বিকাশ ঘটবে এবং সমাজের কুসংস্কার দূরীভূত হয়ে স্ত্রী শিক্ষাকে অনেকখানি এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে।

১৯১৮ সনে চন্দ্রপ্রভা তেজপুরে নতুন করে প্রতিষ্ঠিত বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষয়িত্রী রূপে নিযুক্ত হন। মহাবাহু ব্রহ্মপুত্রের তীরে পাহাড় সমতলের অপূর্ব সমন্বয়ে গড়ে ওঠা, বাণ রাজার কন্যা উষার রোমান্টিক প্রেমে সমৃদ্ধ শোণিতপুর, তেজপুর। সবাই বলে থাকেন এই তেজপুর শহর সাহিত্য-সংস্কৃতি, রাজনৈতিক চেতনায় সমগ্র অসমের মধ্যে অগ্রণী। এই চেতনায় সমৃদ্ধ তেজপুরের  যুবশক্তির উদ‍্যম যুবতী চন্দ্রপ্রভার  অন্তরে র্নিহিত থাকা কর্মোদ‍্যমকে  জাগ্রত করে তোলে। তেজপুরের সামাজিক জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে থাকা আগরওয়ালা পরিবারের পরমানন্দ আগরওয়ালা এবং তাঁর পত্নী কিরণময়ী  আগরওয়ালা স্বাভাবিকভাবেই চন্দ্রপ্রভাকে আদর করে কাছে টেনে নিলেন। ফলে চন্দ্রপ্রভার পক্ষে অতি দ্রুত তেজপুরের সামাজিক জীবনের সঙ্গে মিশে যাওয়া সম্ভব হয়েছিল। এইসময় তেজপুরে অসম ছাত্র সম্মেলনের বিরাট অধিবেশনের আয়োজন করা হয়েছিল। জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা ছিলেন স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর অধিনায়ক, অমিয় কুমার দাস ছাত্র সম্মেলনের সম্পাদক। জ্যোতিপ্রসাদ স্বেচ্ছাসেবিকাদের কুচকাওয়াজ শেখানোর দায়িত্ব দিলেন চন্দ্রপ্রভাকে। অমিয়কুমার দাস নিজেই উত্থাপন করা আফি নিবারণ প্রস্তাবের সমর্থনের জন্য চন্দ্রপ্রভাকে অনুরোধ করলেন। জীবনে প্রথমবারের জন্য চন্দ্রপ্রভা জনগণের মঞ্চে দাঁড়িয়ে কথা বলার সুযোগ পেলেন। ঘুমন্ত সিংহিনী যেন সেদিন গর্জন করে উঠল। প্রতিটি শব্দ যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ হয়ে চন্দ্রপ্রভার কণ্ঠ থেকে নির্গত হতে লাগল। সভায়  উপস্থিত প্রত্যেকেই এই অসামান্য নতুন প্রতিভাকে স্বাগত জানাল। চন্দ্রপ্রভা যেন সূর্যের প্রভার মত জ্বলজ্বল করছিলেন

দ্বিতীয় পর্ব 

 

 

 

 

 

 

আমাদের চন্দ্রপ্রভা শইকীয়ানী - ৭ (বাসুদেব দাস)

  অতুলের জন্মের পর থেকে দণ্ডিনাথ কলিতা চন্দ্রপ্রভাকে মাসে দশ টাকা করে পাঠাতেন । এই ১০   টাকা দিয়েই মা ছেলেকে সারা মাস চালাতে হত। সেই সময় ...