বৃহস্পতিবার, ২৯ জুলাই, ২০২১

আমাদের চন্দ্রপ্রভা শইকীয়ানী - ৫ (বাসুদেব দাস)

 


তেজপুরের ছাত্র সম্মেলনেই চন্দ্রপ্রভার সঙ্গে পরিচয় হয় তেজপুরের একজন প্রতিভাশালী উদীয়মান যুবক দণ্ডিনাথ কলিতার সঙ্গে। কলিতা শিক্ষিত এবং গান্ধিজির আদর্শের অনুগামী। তিনি ছিলেন বৃত্তিতে শিক্ষক। চন্দ্রপ্রভাও এই সদগুণের অধিকারিনী ছিলেন। তাই এই দুই মেধা, ব্যক্তিত্ব, একই বৃত্তি এবং সর্বোপরি একই আদর্শের অনুগামী যুবক যুবতি পরস্পর পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট হলেন। তেজপুরের প্রতিভাশালী, উদীয়মান যুবক দণ্ডিনাথের বিষয়ে চন্দ্রপ্রভা হয়তো বিভিন্ন লোকমুখে শুনেছেন। বিশেষ করে তেজপুরের মহিলা সমিতি কিভাবে দুঃখী ছাত্রদের আর্থিক সাহায্য করতেন সেই সম্পর্কে চন্দ্রপ্রভা সচেতন ছিলেন। তিনি এটাও শুনেছিলেন যে দণ্ডিনাথ মহিলা সমিতির সাহায্য নিয়ে পড়াশোনা করছিলেন। দণ্ডিনাথের বিষয়ে শুনে শুনে প্রত্যক্ষ সাক্ষাৎ না ঘটলেও দণ্ডিনাথ হয়তো চন্দ্রপ্রভার কাছে অনেকটাই পরিচিতের মতো হয়ে পড়েছিলেন। হয়তো চন্দ্রপ্রভার মানস পটে থাকা আদর্শ পুরুষের ছবি হিসেবে দণ্ডিনাথের মধ্যেই নিজের দয়িতকে খুঁজে পেয়েছিলেন। তেজপুর বালিকা ছাত্রবৃত্তি স্কুলের চৌহদে প্রধান শিক্ষয়িত্রী চন্দ্রপ্রভা বাস করতেন। কাছেই দণ্ডিনাথ কলিতার বাসগৃহ। কলিতা তখন অবিবাহিত, ত্রিশ বছরের সফল যুবক। ছেলেদের স্কুলের শিক্ষক। কলিতা চন্দ্রপ্রভা থেকে বয়সে বড়। সাহিত্যিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। দুজনেই একে অপরের দ্বারা উপকৃত হয়েছিলেন। কলিতা চন্দ্রপ্রভার স্কুলের ছাত্রীদের অনুষ্ঠানে পরিবেশন করার জন্য গান রচনা করে দিয়েছিলেন। চন্দ্রপ্রভার লেখা ‘বাঁহী’ পত্রিকায় প্রকাশের ব্যাপারেও দণ্ডিনাথ কলিতার যথেষ্ট ভূমিকা ছিল।

        যুগে যুগে প্রতিভা প্রতিভাকে আকর্ষণ করে এসেছে, কখনও হয়তো স্বর্গীয় প্রেম রূপে, কখনও মোহরূপে। রক্ষণশীল সমাজ পবিত্র প্রেমকে কখনও স্বীকৃতি দান করে না। স্বাভাবিক ভাবেই দুইজনের সম্পর্ক একদিন প্রেমে পরিণতি লাভ করে। সম্বন্ধ গভীরতায় পরিণত হয়ে চন্দ্রপ্রভা অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। কলিতার পরিবার চন্দ্রপ্রভাকে পুত্রবধূ হিসেবে গ্রহণ করতে অস্বীকার করে। তাদের মতে দণ্ডিনাথের পরিবারের তুলনায় চন্দ্রপ্রভার পরিবার নিচু জাতের। দণ্ডিনাথও চন্দ্রপ্রভাকে স্ত্রী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে। বাড়ির বড় ছেলে এবং একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলে হয়ে পিতা-মাতার মতের বিরুদ্ধে গিয়ে চন্দ্রপ্রভাকে বিয়ে করার সাহস জোগাড় করতে পারেন না। চন্দ্রপ্রভা তেজপুরের চাকরি ছেড়ে পিতৃগৃহে ফিরে যান। এই ঘটনা দুজনেরই ব্যক্তিজীবনে তুফানের সৃষ্টি করে এবং প্রেম, বিবাহ এবং নারী অধিকার সম্বন্ধে তৎকালীন সমাজে নানা প্রশ্ন উত্থাপিত হয়।

        চন্দ্রপ্রভা-দণ্ডিনাথের মাঝখানকার প্রেমের সম্বন্ধ এবং বিশেষ করে তাঁর অসফল পরিণতি ‘স্ত্রীশিক্ষা’ বা ‘নারী স্বাধীনতা’-র ক্ষেত্রে সমাজের দুমুখো মনোভাবকে প্রকট করে তোলে। যুক্তি বা আদর্শের স্তরে পুরুষের সঙ্গে নারীর সমতা স্বীকার করে নিলেও— রাজনৈতিক, সামাজিক ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণকে স্বাগত জানালেও— পুরুষ নারীর ব্যক্তিগত সম্পর্কে সমাজের বিচার-বিধান যে সেই অচলায়তনের নাগপাশেই আজও বাঁধা পড়ে আছে— তা একেবারে পরিষ্কার হয়ে গেল। অসমে গান্ধির অসহযোগ আন্দোলনের অন্যতম প্রবর্তক চন্দ্রনাথ শর্মার অন্তরঙ্গ বন্ধু এবং তাঁর সঙ্গে অসমের গ্রামেগঞ্জে সমাজ সংস্কারের কাজে ঘুরে বেড়ানো সহকর্মী দণ্ডিনাথ কলিতাও সমাজ সংস্কারের কাজে ব্রতী ছিলেন। ছাত্রাবস্থা থেকেই তিনি ব্যঙ্গ কবিতা লিখে অস্পৃশ্যতা, বাল্যবিবাহ, জাতপাতের বিচার ইত্যাদি সমাজের জন্য ক্ষতিকর প্রথার অপকারিতা সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করে দিয়েছিলেন। সামাজিক বিষয়ে উদার হলেও দণ্ডিনাথ কলিতা নারীর বিষয়ে বা পুরুষ নারীর সম্বন্ধের বিষয়ে নিজেকে সমাজের পুরোনো সংস্কার থেকে মুক্ত করে নিতে পারেনি। গ্রামের দুঃখী কিন্তু সংস্কৃতিবান পরিবারের সন্তান কলিতা কটন কলেজে আধুনিক শিক্ষা লাভ করেও নারী-পুরুষের সম্বন্ধে সমাজে প্রচলিত ধারণা থেকে মুক্ত হতে পারেন নি।

        চন্দ্রপ্রভার মতো রাজনীতিতে দণ্ডিনাথ কলিতার বিশেষ আগ্রহ ছিল না। তিনি ছিলেন মূলত সাহিত্যিক। তেজপুরে গান্ধিবাদী আন্দোলনের জোয়ার আনার মূলে ছিলেন কলিতার অন্তরঙ্গ বন্ধু চন্দ্রনাথ শর্মা। একদিকে চন্দ্রনাথ শর্মা দেখানো আদর্শ, অন্যদিকে চন্দ্রপ্রভার উৎসাহ কলিতাকেও সাময়িকভাবে গান্ধিবাদী হয়ে উঠতে উৎসাহ জুগিয়েছিল। তেজপুরের যুবকদের মন পুলকিত করা এই ঘটনাবলী চন্দ্রপ্রভা কলিতার সম্বন্ধ গাঢ় এবং তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলা ছাড়াও অধিক জটিল এবং সমস্যা জর্জরিত করে তুলেছিল। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে মহাত্মা গান্ধির ভূমিকা অনন্স্বীকার্য হলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাঁর চিন্তা দ্ব্যর্থব্যঞ্জনা থেকে মুক্ত নয়। বিশেষ করে চন্দ্রপ্রভা গ্রহণ করা দুটি বিষয়ে— নারীর স্বাধীনতা এবং অস্পৃশ্যতা বর্জন বনাম জাত পাত বিচারের বৈধতা— এই দুটি বিষয় হয়ে উঠল দণ্ডিনাথ কলিতা এবং চন্দ্রপ্রভার জীবনের বিভেদের মূল কারণ।

        দেশের সমস্ত শক্তি একত্রিত করার জন্য গান্ধিজি রাজনৈতিক বিপ্লবকে সামাজিক বিপ্লবের রূপ দান করেছিলেন। আর দশটি বিপ্লবের মতোই সমাজের শোষিত, দলিতকে মুক্তির স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল। নারীমুক্তির ধারণা ফরাসি বিপ্লবে প্রথম প্রকাশ পায়, পরে রুশ বিপ্লবেও তা উচ্চারিত হয়। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে দেশের জনসাধারণের সঙ্গে অনুন্নত শ্রেণি এবং নারীরাও মুক্তির স্বপ্ন দেখেছিল। গান্ধিজির আহ্বানে সম্ভ্রান্ত এবং সাধারণ ঘরের নারী রাজপথে বেরিয়ে এসেছিল। স্ত্রীশিক্ষা, বাল্যবিবাহ, বিধবার পুনর্বিবাহ আদি সংস্কারমূলক চিন্তা উচ্চারিত হয়েছিল। চন্দ্রপ্রভার মতো নারীবাদী চিন্তায় উদ্বুব্ধ শিক্ষিতা নারী গান্ধিজির নারীর অধিকার সম্পর্কীয় প্রস্তাবে সম্পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছিল। যৌবনের উৎসাহে ভাসতে থাকা আশাবাদী চন্দ্রপ্রভার সমাজের কঠোরতা সম্পর্কে  কোনো ধারণা ছিল না। সে ভেবেছিল পুরোনো সংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কলিতাকে সহযোদ্ধা হিসেবে লাভ করবে। প্রথমদিকে দণ্ডিনাথ কলিতাও চন্দ্রপ্রভা তেজস্বী ভাষায় তুলে ধরা যুক্তির প্রতি সায় দিয়েছিলেন বলে মনে হয়। সেইসময় কলিতার ‘বাঁহী’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি বিশেষ ছোটগল্প ‘সধবা নে বিধবা নে কুমারী?’ পড়লে এমনটাই মনে হয়। 

        গল্পের নায়িকা প্রতিমাকে সমাজ থেকে এই প্রশ্নটি শুনতে হওয়ায় সে বাল্যবিবাহের অযৌক্তিকতা এভাবে ব্যাখ্যা করে— ‘যেখানে প্রেমের কণিকা মাত্র নেই, যেখানে বয়সের মিল পর্যন্ত পাওয়া যায় না, যা কী জিনিস আমি বুঝতেই পারিনি, তার জন্য জীবন বলি দেওয়া নির্বোধ ছাড়া অন্য কারও কাজ হতে পারে না।প্রতিমা বাল্যকালে বিয়ে হয়ে পরিণত হওয়ায় স্বামীকে প্রত্যাখান করে— স্বামী জীবিত না মৃত কোনো খবর করেনি— তাই সধবা না বিধবা জানে না— যদিও নিজের চোখে সে কুমারী হয়েই আছে। এটা যে চন্দ্রপ্রভার ভাষা তাতে কোনো সন্দেহ নেই কারণ, নায়িকা প্রতিমাকে গল্পকার বর্ণনা করেছেন এভাবে— ‘প্রতিমা শিক্ষিত, সে লেখাপড়া জানে, সেলাই জানে, রান্নাবান্না জানে, গান-বাজনাও জানে। এমনকি নির্ভীকভাবে যার তার সঙ্গে কথা বলতে জানে, সভা সমিতিতে যোগদান করে এবং রাজনীতি সমাজনীতির আলোচনাও করে।’ চন্দ্রপ্রভা ছাড়া তখনকার তেজপুরে কেন, সমগ্র অসমেই এই ধরনের আর দ্বিতীয় কোনো নারী চরিত্র ছিল কি? এটাই শেষ নয়, হুবহু এই একই যুক্তি পরবর্তীকালে চন্দ্রপ্রভা শইকীয়ানী রচিত ‘দৈবজ্ঞ দুহিতা’ গল্পের নায়িকা মেনকার মুখেও আমরা দেখতে পাই।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আমাদের চন্দ্রপ্রভা শইকীয়ানী - ৭ (বাসুদেব দাস)

  অতুলের জন্মের পর থেকে দণ্ডিনাথ কলিতা চন্দ্রপ্রভাকে মাসে দশ টাকা করে পাঠাতেন । এই ১০   টাকা দিয়েই মা ছেলেকে সারা মাস চালাতে হত। সেই সময় ...