সোমবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০২১

আমাদের চন্দ্রপ্রভা শইকীয়ানী - ৭ (বাসুদেব দাস)


 

অতুলের জন্মের পর থেকে দণ্ডিনাথ কলিতা চন্দ্রপ্রভাকে মাসে দশ টাকা করে পাঠাতেন । এই ১০  টাকা দিয়েই মা ছেলেকে সারা মাস চালাতে হত। সেই সময় এটা অসম্ভব ছিল না ভাই ধর্মও সেসময় দরঙের  কোনো এক সাহেবের গাড়ি চালিয়ে বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক প্রায় ত্যাগ  করেছিলেন। বোন রজনীপ্রভা কলকাতায় মিশনারিদের সাহায্যে ডাক্তারি পড়ছিলেন। রজনীপ্রভা মাসিক ১০৫ টাকা বৃত্তি পেয়ে তার থেকে ৩৫ টাকা প্রভার কাছে ঘর চালানোর খরচ  হিসেবে পাঠাতেন। এই সময়ে অর্থাৎ ১৯২৩ সনের শেষের দিকে  চন্দ্রপ্রভাকে  কালজিপাড়ার বালিকা বিদ্যালয়ের দায়িত্ব নিতে হয়। কালজিপাড়ার জনগণের আগ্রহ, বিশেষ করে বরপেটার লোকাল বোর্ডের চেয়ারম্যান লোহিত নায়কের আগ্রহ এবং অনুরোধে তিনি এই দায়িত্ব গ্রহণ করতে বাধ্য হন। এদিকে শিশু অতুলের খরচ বেড়েই চলেছিল তাই নিজের প্রয়োজনের জন্যও তিনি চাকরিটা গ্রহণ করলেন। সেই সময়ের নিরিখ অনুযায়ী তার বেতন ছিল মাসে ত্রিশ টাকা। শুরুর দিকে তিনি বাড়ি থেকে স্কুলে যাওয়া আসা করতেন। এক বছরের অতুলকে কোলে নিয়ে স্কুলে যাওয়া আসা করতে দেখে কালজিপাড়ার একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি গোপীনাথ মেধি  প্রতিদিন ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে দূর থেকে আসা যাওয়ার পরিবর্তে তাঁর বাড়িতে থাকার প্রস্তাব দিলেন। গোপীনাথের পিতা সমর বায়ন কামরূপের প্রজা বিদ্রোহে গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ করেছিলেন। গোপীনাথও গান্ধিজির আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন। তাই এমন একটি পরিবার গ্রামের অন্যান্য লোকদের চেয়ে অনেকটাই উদার ছিল। কালজিপাড়ার বালিকা বিদ্যালয়ে চন্দ্রপ্রভা ১৯২৬  সন পর্যন্ত শিক্ষকতা করেন। এই সময় বিভিন্ন গঠনমূলক কার্যসূচি ছাড়া স্বাধীনতার আন্দোলন স্তিমিত হয়ে এসেছিল। তাই চন্দ্রপ্রভা স্কুলে শিক্ষকতা করা, সামাজিক  সামাজিক কুসংস্কার দূর করা, সুতোকাটা ইত্যাদি কাজে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছিলেন। সম্ভবত এই সময় থেকেই তিনি গল্প উপন্যাস লিখতে শুরু করেন। শৈশব থেকেই চন্দ্রপ্রভা যেকোনো বৈষম্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে দ্বিধা করতেন না। এইকালজিপাড়াতেও জাতির নামে সমাজে যে কুসংস্কার প্রচলিত ছিল চন্দ্রপ্রভা তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালেন। কালজিপাড়া গ্রামের সত্রের কাছে একটা কীর্তন ঘর ছিল। কীর্তন ঘরের সীমানার মধ্যে লোকাল বোর্ডের একটি কুয়ো ছিল। কুয়োর জল তোলার ক্ষেত্রে তথাকথিত উচ্চবর্ণের লোকরা নিম্নবর্ণের লোকদের উপর বাধানিষেধ আরোপ করেছিল। চন্দ্রপ্রভা সে কথা জানতে পেরে সত্রাধিকারের কাছে এর প্রতিকারের আবেদন জানালেন। যুক্তির দ্বারা বুঝিয়ে দিলেন যে তথাকথিত নিচু জাতির  স্পর্শে জল কখনও অস্পৃশ‍্য হতে পারে না। সত্রাধিকার চন্দ্রপ্রভার যুক্তিতে আস্থা স্থাপন করে কুয়োর জল সবার জন্য মুক্ত করে দিলেন।

এভাবে কালজিপাড়ায় চন্দ্রপ্রভার প্রায় তিন বছর অতিক্রান্ত হয়ে যায়। এখানে থাকার সময়েই ১৯২৫ সনে নগাঁও শহরে অনুষ্ঠিত অসম সাহিত্য সভার অষ্টম বার্ষিক অধিবেশনে তিনি প্রতিনিধি হিসেবে যোগদান করেন । স্কুল থেকে ছুটি নিয়ে চন্দ্রপ্রভা শিশুপুত্র অতুলকে সঙ্গে নিয়ে এই সভায় যোগ দিয়েছিলেন। সাহিত্য সভার এই অধিবেশনকে অসমের নারী আন্দোলনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বলা যেতে পারে। পরবর্তীকালের অসমের নারী আন্দোলনের বীজ এতে অঙ্কুরিত হয়েছিল বলা যেতে পারে।

 ১৯২৬ সনের ২৬ ডিসেম্বর থেকে ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত গুয়াহাটির পান্ডু নগরী অনুষ্ঠিত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ৪১ তম অধিবেশনটি এস শ্রীনিবাস আয়েঙ্গারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় গান্ধিজি ছাড়াও নেহেরু, বল্লভ ভাই প্যাটেল, রাজেন্দ্রপ্রসাদ,মদনমোহন মালব্য, মহম্মদ আলি, শওকত আলি, সরোজিনী নাইডু ইত্যাদি বিশিষ্ট কংগ্রেস নেতারা যোগদান করেছিলেন। চন্দ্রপ্রভা কংগ্রেস জনসভায় যোগ দেওয়ার জন্য ছুটির আবেদন করলেন। কিন্তু স্কুল কর্তৃপক্ষ ছুটি মঞ্জুর করলেন না। চন্দ্রপ্রভা খুব দুঃখ পেলেন। যে সময়  সমগ্র দেশ দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছিল সেই সময় তার স্কুল সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ হয়ে থাকবে কি? তিনি কংগ্রেস মহা সভায় যোগ দেবার জন্য চাকরিতে ইস্তফা দিলেন।

নারীর অধিকার সম্পর্কে চন্দ্রপ্রভা কিশোরী বয়স থেকেই সচেতন ছিলেন। এই সচেতনতা তার মজ্জাগত  ছিল এবং এটাই পরবর্তীকালে তার আদর্শ হয়ে পড়ে। এই আদর্শ তার মনে রোপণ  করায় গান্ধিজির লেখা সমূহ এবং তার নেতৃত্বের তৎকালীন কংগ্রেসের নারী এবং সমাজে নারীর ভূমিকা সম্পর্কীয় এবং কার্যাবলী ও সাহায্য করেছিল।

চন্দ্রপ্রভা পিতার মৃত্যুর পরে তাঁর অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে ভাই ধর্মেশ্বর পিতৃ সম্পত্তি বিক্রি করে টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়। ছেলেদের মতো মেয়ে ও পিতার সম্পত্তির অধিকারিনী এই বিশ্বাসে বলীয়ান চন্দ্রপ্রভা পিতার সম্পত্তি উদ্ধারের জন্য মামলা করেছিলেন এবং সম্পত্তির কিছু অংশ উদ্ধার করে মা এবং পিতৃ-মাতৃহীন ভাগ্নের থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।

চন্দ্রপ্রভার সাহিত্য তথা অসম সাহিত্যসভার প্রতি ছোটবেলা থেকেই আকর্ষণ ছিল। এই আকর্ষণের টানেই তিনি ‘বাঁহী’, আবাহন’-এ লিখতে শুরু করেন। ‘অভিযাত্রী’ নামে পত্রিকা সম্পাদনা শুরু করেন।

রবিবার, ১ আগস্ট, ২০২১

আমাদের চন্দ্রপ্রভা শইকীয়ানী - ৬ (বাসুদেব দাস)

 

চন্দ্রপ্রভা শইকীয়ানী এবং দণ্ডিনাথ কলিতার প্রেমের সম্পর্ক সাহিত্যচর্চার মধ্য দিয়ে আরম্ভ হয়েছিল যদিও এর পূর্ণ বিকাশ ঘটে ১৯২০ সনে, মহাত্মা গান্ধির দ্বারা পরিকল্পিত এবং পরিচালিত অসহযোগ আন্দোলনের পটভূমিতে। সেই সনের ডিসেম্বর মাসে অসম অ্যাসোসিয়েশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশন তেজপুরে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কলকাতায় অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের অধিবেশনে গ্রহণ করা অসহযোগ আন্দোলনের প্রস্তাবটি পূর্ণ সমর্থন করে ১৯২০ সনে অসমেও আন্দোলন শুরু করার প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। যদিও আগে থেকেই কয়েকজন সম্ভ্রান্ত মহিলা কংগ্রেসের সভায় অংশ গ্রহণ করে আসছিলেন, প্রকৃতপক্ষে এই সময় থেকে সাধারণ মহিলাদের জন্য কংগ্রেসের প্রবেশ দ্বার উন্মুক্ত করা হয়। মহাত্মা গান্ধির পরিকল্পনা অনুসারে অসহযোগ আন্দোলনে মহিলাদের জন্য নির্দিষ্ট এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। ১৯২১ সনের আগস্ট মাসে কার্যসূচি প্রচার করার জন্য গান্ধিজি স্বয়ং অসমে আসেন। সঙ্গে আসেন মহম্মদ আলি এবং তাঁর বোরখা পরিহিতা পত্নী বেগম আলি। তেজপুর সহ গান্ধিজি ভ্রমণ করা প্রতিটি শহরে গান্ধিজি বেগম আলিকে নিয়ে একটি পৃ্থক মহিলা সভার আয়োজন করে সভায় উপস্থিত মহিলাদের আন্দোলনের কার্যসূচি বুঝিয়ে দিয়ে তাদের সহযোগিতা আহ্বান করা হয়। বলাবাহুল্য তেজপুরের সমস্ত কার্যসূচিতে চন্দ্রপ্রভা ওতঃপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। তেজপুরে থাকা সময়টুকু চন্দ্রপ্রভা গান্ধীজিকে ছায়ার মতো অনুসরণ করেছিলেন। সেদিন থেকেই গান্ধিজির অনুসরণকারী হয়ে উঠলেও গান্ধিজির বাণীর দুটি অংশ বিশেষভাবে তার মনে গেঁথে গিয়েছিল— নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রতি দেওয়া আহ্বান এবং অস্পৃশ্যতা বিরোধী সংগ্রাম।

        স্ত্রীশিক্ষা এবং নারী স্বাধীনতার বিষয়কে কেন্দ্র করে দণ্ডিনাথ কলিতার মনে যে আলোড়নের সৃষ্টি হয়েছিল তা কলিতা রচিত দুটি উপন্যাস— ‘সাধনা’ (১৯২৮) এবং আবিষ্কার’ (১৯৪৮) উপন্যাসে ফুটে উঠেছে। সাধনা উপন্যাসের ঘটনাকাল ১৯১০ সনের স্বদেশী আন্দোলন বলা হয়েছে যদিও উপন্যাসটি যে সাম্প্রতিক কালের ঘটনাবলী নিয়ে গড়ে উঠেছে সেই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। সাধনা’ উপন্যাসের নায়ক দীনবন্ধু একজন আদর্শ গান্ধিবাদী। অসহযোগ আন্দোলন স্থগিত হওয়ার পরে গান্ধির প্রস্তাবিত গঠনমূ্লক পরিকল্পনার সমর্থনে তিনি স্ত্রী-শিক্ষা, শিল্পের ক্ষেত্রে তাঁর জাতীয়তাবাদী চিন্তার জন্য অবশেষে তাকে জেলে যেতে হয়। কিন্তু উপন্যাসটির প্রধান উদ্দেশ্য দীনবন্ধুর চরিত্রকে কেন্দ্র করে স্ত্রী-শিক্ষা সম্বন্ধে লেখকের নিজের কিছু ধারণা ব্যক্ত করা। এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে তিনি তিনটি বিপরীতধর্মী নারী চরিত্রের অবতারণা করেছেন। তিনজনেই শিক্ষিতা, কিন্তু বিভিন্ন ধরনের শিক্ষার প্রভাব তাদের চরিত্রে বিভিন্নভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। প্রধান নায়িকা প্রভাবতীর শিক্ষার অভিজ্ঞতা বিষয়ে বিশেষ কিছু বলা হয়নি যদিও তাঁর চরিত্রে পাশ্চাত্য শিক্ষার ছাপ পড়েছে। সে ছোট ভাইয়ের সঙ্গে বাড়ি থেকে দূরে ঘর ভাড়া করে থাকে এবং একটি অসমিয়া বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করে তাতে শিক্ষয়িত্রী হওয়ার পরিকল্পনা করে। তাঁর বাড়িতে পুরুষের আসার কোনো বাধা নিষেধ নেই। অভ্যাগতের সঙ্গে বসে নানা বিষয়ে আলোচনা করে। প্রভাবতীর চরিত্র এবং কার্যকলাপের সঙ্গে তেজপুরের চন্দ্রপ্রভা দাসের সঙ্গে অনেক সাদৃশ্য রয়েছে। বলা যায় যে এই চরিত্রটি চন্দ্রপ্রভার আদলে তৈরি। দুটি চরিত্রের মধ্যে অন্য একটি সাদৃশ্য হল চন্দ্রপ্রভার মতো প্রভাবতীও স্ত্রী শিক্ষার প্রসারের জন্য উৎসর্গীকৃত।

১৯১৯ সনে চন্দ্রপ্রভার অন্য একটি প্রতিভা বা ক্ষমতা সবাইকে মুগ্ধ করেছিল— তা হল তাঁর মিলন সূত্র রচনার ক্ষমতা। ১৯১৯ সনে তেজপুরে অনুষ্ঠিত অসম অ্যাসোসিয়েশনের অধিবেশনে নতুন কমিটি গঠন সম্পর্কে যে তুমুল বাকবিতণ্ডার সৃষ্টি হয়েছিল, তার পরিসমাপ্তি ঘটানো সম্ভব হয়েছিল চন্দ্রপ্রভার অপূর্ব যুক্তির দ্বারা। প্রসন্ন কুমার বরুয়া তাঁর যুক্তিকে সমর্থন জানিয়ে তাঁর ব্যক্তিত্বকে অভিনন্দন জানিয়েছিল। এই সভায় কর্মবীর চন্দ্রশর্মার ওজস্বী বক্তৃতার পরে চন্দ্রপ্রভাব আলোড়ন সৃষ্টিকারী ভাষণ সবাইকে মুগ্ধ করেছিল। ১৯২১ সনের ২০ আগস্ট গান্ধিজি তেজপুরে মাটিতে পা রাখেন। গান্ধিজির পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করে তোলার জন্য একটা সংগঠনের প্রয়োজন। তাই চন্দ্রপ্রভা মহিলাদের এই কাজের জন্য সংগঠিত করার ব্রত গ্রহণ করলেন এবং সমগ্র অসমে মহিলা সমিতি গঠন করার স্বপ্ন দেখলেন। ডিব্রুগড়ে ১৯১৫ সনে ডঃ তিলোত্তমা রায়চৌধুরী এবং স্বনামধন্যা অমলপ্রভা দাসের মাতা হেমপ্রভা দাস ‘ডিব্রুগড় মহিলা সমিতি’ নামে স্ত্রী শিক্ষা প্রসারের উদ্দেশ্যে একটি সমিতি গঠন করেন।

        ১৯২৫ সনে নগাঁও শহরে অনুষ্ঠিত সাহিত্য সভার অধিবেশনে একটি অভাবিত ঘটনা ঘটেছিল— যে ঘটনাকে অসমের মহিলা সমাজের প্রথম সামাজিক বিদ্রোহ বলা যেতে পারে। চন্দ্রপ্রভা প্রতিনিধি হিসেবে মণ্ডপে বসে থেকে দেখলেন যে শত শত মহিলা চিকের আড়ালে পুরুষদের সংস্পর্শ বাঁচিয়ে বসে রয়েছে। এই অসাম্যের বিরুদ্ধে চন্দ্রপ্রভার বিদ্রোহী মন গর্জে উঠল। তাঁর স্বাধীনচেতা মন এই দৃশ্য সহ্য করতে পারল না। সেই সভায় কার্যসূচি ঘোষণা করার সঙ্গে সঙ্গে চন্দ্রপ্রভা তীব্র জ্বালাময়ী ভাষায় এই অসাম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানালেন। অভ্যর্থনা  সমিতিকে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, জাতির অর্ধেক অংশকে এভাবে চিকের আড়ালে রেখে আমরা সমাজের কোন কল্যাণ সাধন করব? তারপর চিকের আড়ালে উপস্থিত মহিলাদের সম্বোধন করে তিনি গঞ্জনার সুরে বললেন— ‘এভাবে খাঁচার মধ্যে বন্দি হয়ে থাকতে আপনাদের আত্মসম্মানে আঘাত লাগছে না বা লজ্জা করছে না? সিংহিনীর মতো চিকের আড়াল ভেদ করে বেরিয়ে আসছেন না কেন? সঙ্গে সঙ্গে শুয়ে থাকা সিংহিনী যেন জেগে উঠল। এক অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখা গেল। চিক ছিন্ন ভিন্ন করে কিছু সাহসী উজ্জ্বল নয়না, প্রতিভাদীপ্ত মুখ পেছন থেকে এসে সামনের বেঞ্চে বসল। বিপুল জনতা করতালির দ্বারা এগিয়ে আসা মহিলাদের স্বাগত জানাল।

        ১৯২৬ সনে রহায় অসম সাহিত্য সভার অধিবেশন বসে। সেই অধিবেশনের সভাপতি ছিলেন বেণুধর রাজখোঁয়া। তিনিই চন্দ্রপ্রভাকে সেই অধিবেশনে অসম মহিলা সমিতি গঠন করার কথা বলেন এবং নগাঁওয়ের তিক্ত অভিজ্ঞতা ভুলে যাবার জন্য অনুরোধ করেন। একই সঙ্গে লক্ষীপুরের জমিদার সাহিত্যিক নগেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী এবং তখনকার পুলিশ অফিসার ভুবন চন্দ্র দত্ত সংগঠনের কাজ শুরুর করার জন্য চন্দ্রপ্রভাকে অনুরোধ করেন। রাজখোঁয়ার চেষ্টায় বিজনী হলে তাঁর সভাপতিত্বে অসম মহিলা সমিতির প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়। সমিতির সম্পাদিকার দায়িত্ব দেওয়া হয় চন্দ্রপ্রভা শইকীয়ানীকে। তিনি কোলে শিশুপুত্র অতুলকে নিয়ে অসমের প্রতিটি জেলায় গিয়ে গিয়ে যেভাবে সংগঠনের  কাজ করেছিলেন তা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। তিনি নিজের জায়গা দৈশিঙরী, বজালী এবং বরপেটা অঞ্চলে যানবাহনের অসুবিধার জন্য একটা সাইকেল কিনে নিয়েছিলেন, যে কথা সেই অঞ্চলে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। বজালীর মানুষ তাকে বলত— ‘এই যে বাবারা দেখ— তাকিয়ে দেখ, ঐ মেয়েটা কীভাবে সাইকেলে উঠে চলেছে— লাজ-লজ্জা কিছুই নেই।’ কিন্তু এই বিরূপ সমালোচনা চন্দ্রপ্রভাকে কিছুতেই দমিয়ে দিতে পারল না। অসমে চন্দ্রপ্রভাই বোধহয় প্রথম সাইকেলে আরোহিনী মহিলা— দ্বিতীয় জন বোধহয় স্বর্গীয়া জুবেদা বা জয়ী রহমান।

বৃহস্পতিবার, ২৯ জুলাই, ২০২১

আমাদের চন্দ্রপ্রভা শইকীয়ানী - ৫ (বাসুদেব দাস)

 


তেজপুরের ছাত্র সম্মেলনেই চন্দ্রপ্রভার সঙ্গে পরিচয় হয় তেজপুরের একজন প্রতিভাশালী উদীয়মান যুবক দণ্ডিনাথ কলিতার সঙ্গে। কলিতা শিক্ষিত এবং গান্ধিজির আদর্শের অনুগামী। তিনি ছিলেন বৃত্তিতে শিক্ষক। চন্দ্রপ্রভাও এই সদগুণের অধিকারিনী ছিলেন। তাই এই দুই মেধা, ব্যক্তিত্ব, একই বৃত্তি এবং সর্বোপরি একই আদর্শের অনুগামী যুবক যুবতি পরস্পর পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট হলেন। তেজপুরের প্রতিভাশালী, উদীয়মান যুবক দণ্ডিনাথের বিষয়ে চন্দ্রপ্রভা হয়তো বিভিন্ন লোকমুখে শুনেছেন। বিশেষ করে তেজপুরের মহিলা সমিতি কিভাবে দুঃখী ছাত্রদের আর্থিক সাহায্য করতেন সেই সম্পর্কে চন্দ্রপ্রভা সচেতন ছিলেন। তিনি এটাও শুনেছিলেন যে দণ্ডিনাথ মহিলা সমিতির সাহায্য নিয়ে পড়াশোনা করছিলেন। দণ্ডিনাথের বিষয়ে শুনে শুনে প্রত্যক্ষ সাক্ষাৎ না ঘটলেও দণ্ডিনাথ হয়তো চন্দ্রপ্রভার কাছে অনেকটাই পরিচিতের মতো হয়ে পড়েছিলেন। হয়তো চন্দ্রপ্রভার মানস পটে থাকা আদর্শ পুরুষের ছবি হিসেবে দণ্ডিনাথের মধ্যেই নিজের দয়িতকে খুঁজে পেয়েছিলেন। তেজপুর বালিকা ছাত্রবৃত্তি স্কুলের চৌহদে প্রধান শিক্ষয়িত্রী চন্দ্রপ্রভা বাস করতেন। কাছেই দণ্ডিনাথ কলিতার বাসগৃহ। কলিতা তখন অবিবাহিত, ত্রিশ বছরের সফল যুবক। ছেলেদের স্কুলের শিক্ষক। কলিতা চন্দ্রপ্রভা থেকে বয়সে বড়। সাহিত্যিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। দুজনেই একে অপরের দ্বারা উপকৃত হয়েছিলেন। কলিতা চন্দ্রপ্রভার স্কুলের ছাত্রীদের অনুষ্ঠানে পরিবেশন করার জন্য গান রচনা করে দিয়েছিলেন। চন্দ্রপ্রভার লেখা ‘বাঁহী’ পত্রিকায় প্রকাশের ব্যাপারেও দণ্ডিনাথ কলিতার যথেষ্ট ভূমিকা ছিল।

        যুগে যুগে প্রতিভা প্রতিভাকে আকর্ষণ করে এসেছে, কখনও হয়তো স্বর্গীয় প্রেম রূপে, কখনও মোহরূপে। রক্ষণশীল সমাজ পবিত্র প্রেমকে কখনও স্বীকৃতি দান করে না। স্বাভাবিক ভাবেই দুইজনের সম্পর্ক একদিন প্রেমে পরিণতি লাভ করে। সম্বন্ধ গভীরতায় পরিণত হয়ে চন্দ্রপ্রভা অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। কলিতার পরিবার চন্দ্রপ্রভাকে পুত্রবধূ হিসেবে গ্রহণ করতে অস্বীকার করে। তাদের মতে দণ্ডিনাথের পরিবারের তুলনায় চন্দ্রপ্রভার পরিবার নিচু জাতের। দণ্ডিনাথও চন্দ্রপ্রভাকে স্ত্রী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে। বাড়ির বড় ছেলে এবং একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলে হয়ে পিতা-মাতার মতের বিরুদ্ধে গিয়ে চন্দ্রপ্রভাকে বিয়ে করার সাহস জোগাড় করতে পারেন না। চন্দ্রপ্রভা তেজপুরের চাকরি ছেড়ে পিতৃগৃহে ফিরে যান। এই ঘটনা দুজনেরই ব্যক্তিজীবনে তুফানের সৃষ্টি করে এবং প্রেম, বিবাহ এবং নারী অধিকার সম্বন্ধে তৎকালীন সমাজে নানা প্রশ্ন উত্থাপিত হয়।

        চন্দ্রপ্রভা-দণ্ডিনাথের মাঝখানকার প্রেমের সম্বন্ধ এবং বিশেষ করে তাঁর অসফল পরিণতি ‘স্ত্রীশিক্ষা’ বা ‘নারী স্বাধীনতা’-র ক্ষেত্রে সমাজের দুমুখো মনোভাবকে প্রকট করে তোলে। যুক্তি বা আদর্শের স্তরে পুরুষের সঙ্গে নারীর সমতা স্বীকার করে নিলেও— রাজনৈতিক, সামাজিক ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণকে স্বাগত জানালেও— পুরুষ নারীর ব্যক্তিগত সম্পর্কে সমাজের বিচার-বিধান যে সেই অচলায়তনের নাগপাশেই আজও বাঁধা পড়ে আছে— তা একেবারে পরিষ্কার হয়ে গেল। অসমে গান্ধির অসহযোগ আন্দোলনের অন্যতম প্রবর্তক চন্দ্রনাথ শর্মার অন্তরঙ্গ বন্ধু এবং তাঁর সঙ্গে অসমের গ্রামেগঞ্জে সমাজ সংস্কারের কাজে ঘুরে বেড়ানো সহকর্মী দণ্ডিনাথ কলিতাও সমাজ সংস্কারের কাজে ব্রতী ছিলেন। ছাত্রাবস্থা থেকেই তিনি ব্যঙ্গ কবিতা লিখে অস্পৃশ্যতা, বাল্যবিবাহ, জাতপাতের বিচার ইত্যাদি সমাজের জন্য ক্ষতিকর প্রথার অপকারিতা সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করে দিয়েছিলেন। সামাজিক বিষয়ে উদার হলেও দণ্ডিনাথ কলিতা নারীর বিষয়ে বা পুরুষ নারীর সম্বন্ধের বিষয়ে নিজেকে সমাজের পুরোনো সংস্কার থেকে মুক্ত করে নিতে পারেনি। গ্রামের দুঃখী কিন্তু সংস্কৃতিবান পরিবারের সন্তান কলিতা কটন কলেজে আধুনিক শিক্ষা লাভ করেও নারী-পুরুষের সম্বন্ধে সমাজে প্রচলিত ধারণা থেকে মুক্ত হতে পারেন নি।

        চন্দ্রপ্রভার মতো রাজনীতিতে দণ্ডিনাথ কলিতার বিশেষ আগ্রহ ছিল না। তিনি ছিলেন মূলত সাহিত্যিক। তেজপুরে গান্ধিবাদী আন্দোলনের জোয়ার আনার মূলে ছিলেন কলিতার অন্তরঙ্গ বন্ধু চন্দ্রনাথ শর্মা। একদিকে চন্দ্রনাথ শর্মা দেখানো আদর্শ, অন্যদিকে চন্দ্রপ্রভার উৎসাহ কলিতাকেও সাময়িকভাবে গান্ধিবাদী হয়ে উঠতে উৎসাহ জুগিয়েছিল। তেজপুরের যুবকদের মন পুলকিত করা এই ঘটনাবলী চন্দ্রপ্রভা কলিতার সম্বন্ধ গাঢ় এবং তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলা ছাড়াও অধিক জটিল এবং সমস্যা জর্জরিত করে তুলেছিল। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে মহাত্মা গান্ধির ভূমিকা অনন্স্বীকার্য হলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাঁর চিন্তা দ্ব্যর্থব্যঞ্জনা থেকে মুক্ত নয়। বিশেষ করে চন্দ্রপ্রভা গ্রহণ করা দুটি বিষয়ে— নারীর স্বাধীনতা এবং অস্পৃশ্যতা বর্জন বনাম জাত পাত বিচারের বৈধতা— এই দুটি বিষয় হয়ে উঠল দণ্ডিনাথ কলিতা এবং চন্দ্রপ্রভার জীবনের বিভেদের মূল কারণ।

        দেশের সমস্ত শক্তি একত্রিত করার জন্য গান্ধিজি রাজনৈতিক বিপ্লবকে সামাজিক বিপ্লবের রূপ দান করেছিলেন। আর দশটি বিপ্লবের মতোই সমাজের শোষিত, দলিতকে মুক্তির স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল। নারীমুক্তির ধারণা ফরাসি বিপ্লবে প্রথম প্রকাশ পায়, পরে রুশ বিপ্লবেও তা উচ্চারিত হয়। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে দেশের জনসাধারণের সঙ্গে অনুন্নত শ্রেণি এবং নারীরাও মুক্তির স্বপ্ন দেখেছিল। গান্ধিজির আহ্বানে সম্ভ্রান্ত এবং সাধারণ ঘরের নারী রাজপথে বেরিয়ে এসেছিল। স্ত্রীশিক্ষা, বাল্যবিবাহ, বিধবার পুনর্বিবাহ আদি সংস্কারমূলক চিন্তা উচ্চারিত হয়েছিল। চন্দ্রপ্রভার মতো নারীবাদী চিন্তায় উদ্বুব্ধ শিক্ষিতা নারী গান্ধিজির নারীর অধিকার সম্পর্কীয় প্রস্তাবে সম্পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছিল। যৌবনের উৎসাহে ভাসতে থাকা আশাবাদী চন্দ্রপ্রভার সমাজের কঠোরতা সম্পর্কে  কোনো ধারণা ছিল না। সে ভেবেছিল পুরোনো সংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কলিতাকে সহযোদ্ধা হিসেবে লাভ করবে। প্রথমদিকে দণ্ডিনাথ কলিতাও চন্দ্রপ্রভা তেজস্বী ভাষায় তুলে ধরা যুক্তির প্রতি সায় দিয়েছিলেন বলে মনে হয়। সেইসময় কলিতার ‘বাঁহী’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি বিশেষ ছোটগল্প ‘সধবা নে বিধবা নে কুমারী?’ পড়লে এমনটাই মনে হয়। 

        গল্পের নায়িকা প্রতিমাকে সমাজ থেকে এই প্রশ্নটি শুনতে হওয়ায় সে বাল্যবিবাহের অযৌক্তিকতা এভাবে ব্যাখ্যা করে— ‘যেখানে প্রেমের কণিকা মাত্র নেই, যেখানে বয়সের মিল পর্যন্ত পাওয়া যায় না, যা কী জিনিস আমি বুঝতেই পারিনি, তার জন্য জীবন বলি দেওয়া নির্বোধ ছাড়া অন্য কারও কাজ হতে পারে না।প্রতিমা বাল্যকালে বিয়ে হয়ে পরিণত হওয়ায় স্বামীকে প্রত্যাখান করে— স্বামী জীবিত না মৃত কোনো খবর করেনি— তাই সধবা না বিধবা জানে না— যদিও নিজের চোখে সে কুমারী হয়েই আছে। এটা যে চন্দ্রপ্রভার ভাষা তাতে কোনো সন্দেহ নেই কারণ, নায়িকা প্রতিমাকে গল্পকার বর্ণনা করেছেন এভাবে— ‘প্রতিমা শিক্ষিত, সে লেখাপড়া জানে, সেলাই জানে, রান্নাবান্না জানে, গান-বাজনাও জানে। এমনকি নির্ভীকভাবে যার তার সঙ্গে কথা বলতে জানে, সভা সমিতিতে যোগদান করে এবং রাজনীতি সমাজনীতির আলোচনাও করে।’ চন্দ্রপ্রভা ছাড়া তখনকার তেজপুরে কেন, সমগ্র অসমেই এই ধরনের আর দ্বিতীয় কোনো নারী চরিত্র ছিল কি? এটাই শেষ নয়, হুবহু এই একই যুক্তি পরবর্তীকালে চন্দ্রপ্রভা শইকীয়ানী রচিত ‘দৈবজ্ঞ দুহিতা’ গল্পের নায়িকা মেনকার মুখেও আমরা দেখতে পাই।

আমাদের চন্দ্রপ্রভা শইকীয়ানী - ৪ (বাসুদেব দাস)

 

         এই অধিবেশনে চন্দ্রপ্রভার ভূমিকা তাঁর নিজের জন্য তথা সমগ্র অসমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তেজপুরে এসে কিরণময়ী  আগারওয়ালার সংস্পর্শে এসে মহিলা সমিতি গঠন, শিল্প স্থাপন ইত্যাদি কর্মের মধ্য দিয়ে চন্দ্রপ্রভার সাংগঠনিক দক্ষতা দেখে তেজপুরের জনগণ— বিশেষ করে সাহিত্য-সংস্কৃতি, দেশপ্রেমের ক্ষেত্রে সচেতন যুবশক্তি মুগ্ধ হয়েছিল বলা যেতে পারে। তাই ছাত্র সম্মেলনের সম্পাদক অমিয় কুমার দাস অধিবেশনে আফি নিবারণের প্রস্তাব সমর্থন করে চন্দ্রপ্রভাকে ভাষণ দেওয়ার জন্য নির্বাচন করেছিলেন চন্দ্রপ্রভা প্রস্তাব সমর্থন করে এমন একটি তেজস্বী যুক্তিপূর্ণ অথচ শ্রুতি মধুর দীর্ঘ ভাষণ দিলেন যে জনগণ তাঁর বক্তৃতায় মুগ্ধ হয়ে দীর্ঘ বক্তৃতা নীরবে শুনে গেল চন্দ্রপ্রভার প্রশিক্ষণে স্বেচ্ছাসেবীদের কুচকাওয়াজ উপস্থিত দর্শক শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছিল সভাপতি আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় যুবক-যুবতীদের এই ধরনের শৃঙ্খলাবদ্ধতাকে ভূয়সী প্রশংসা করলেন। চন্দ্রপ্রভার বক্তৃতায় দেশের প্রতি তাঁর প্রেম, প্রবল নিষ্ঠা এবং কর্মোদ্যমের  পরিচয় ফুটে উঠেছিল।

        সেই সময় অসমিয়া জনগণের দুটি গণ অনুষ্ঠান ছিল— অসম সাহিত্য সভা এবং অসম অ্যাসোসিয়েশন । অসম সাহিত্য সভা ১৯১৭ সনে শিবসাগরে  প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই প্রতিষ্ঠানে সরকারি বেসরকারি চাকুরীজীবিদের ছাড়াও সমস্ত শ্রেণির জনগণ সহযোগিতা করেছিল। ১৯১৯ সনের ডিসেম্বর মাসে বরপেটায় অনুষ্ঠিত অধিবেশনে দুজন মহিলা প্রতিনিধি যোগদান করেছিলেন তারা হলেন রাজবালা দাস এবং চন্দ্রপ্রভা। এই সাহিত্য সভার মঞ্চ থেকে বরপেটার জনগণকে বিশেষ করে মায়েদের সম্বোধন করে চন্দ্রপ্রভা বলেছিলেন যে, মহাপুরুষ শংকরদেবের উদার ভাগবতী ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা করে পরস্পরের মধ্যে কোনো ধরনের ভেদাভেদ সৃষ্টি করা উচিত নয়। সমস্ত কুসংস্কার ত্যাগ করে তথাকথিত নিচু কুলের মানুষ এবং মায়েদের জন্য মন্দিরের দরজা খুলে দেওয়া উচিত। এখানে বলা যেতে পারে যে তখন পর্যন্ত চন্দ্রপ্রভা গান্ধিজির সাক্ষাৎ লাভ করেনি বা গান্ধিজির অস্পৃশ্যতা বর্জন নীতি সম্পর্কে ও তিনি সচেতন ছিলেন না। আসলে চন্দ্রপ্রভা জন্মগতভাবেই সমস্ত প্রকার বৈষম্যের বিরোধী ছিলেন।

        ১৯২১ সনের আগস্ট মাসে গান্ধিজি প্রথমবারের জন্য তেজপুর এসেছিলেন এবং আগরওয়ালা পরিবারের 'পকী'-তে বসবাস করেছিলেন। চন্দ্রপ্রভা গান্ধিজিকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ লাভ করেছিলেন। চন্দ্রপ্রভার ভাষায় গান্ধিজি মহিলাদের সম্বোধন করে বলেছিলেন— 'আমার বোনেরা, স্বরাজ আমাদের জন্মস্বত্ব। আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ হই, ব্রিটিশের সঙ্গে অসহযোগিতা করি, এক বছরের মধ্যে আমরা স্বরাজ লাভ করব।' গান্ধিজির বক্তব্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে চন্দ্রপ্রভা বলেছেন—  প্রতিটি শব্দ যেন অন্তরে তীরের মতো বিধঁল। সবাই যেন স্বরাজ মন্ত্রে দীক্ষিত হল।'

        গান্ধিজির আন্দোলনের নীতি—  বিশেষ  করে স্বাধীনতা আন্দোলনে নারীরাও যে বিশেষ ভাবে সাহায্য করতে পারে খাদি এবং বস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে, এই কথা চন্দ্রপ্রভার মনে গভীর প্রভাব বিস্তার করে। তাই পরবর্তীকালে খাদিস্ত্র উৎপাদন, সুতো কাটা ইত্যাদি পরিকল্পনা গ্রামগুলিতে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে চন্দ্রপ্রভা বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন।

        গান্ধিজি যখন প্রথমবারের জন্য অসম এসেছিলেন তখন সমস্ত রাজ্য জুড়ে বিদেশি বস্ত্র বর্জনের কর্মসূচি চলছিল। গান্ধিজি যখন যেখানে গিয়েছেন, সেখানেই বিদেশী বস্ত্র  দাহ বা 'বস্ত্রমেধ' যজ্ঞ   সম্পন্ন করা হয়েছিল। তেজপুরের 'পকী'-তেও বস্ত্রমেধ যজ্ঞ গান্ধিজি নিজেই সম্পন্ন করেছিলেন। শোনা যায়, বিদেশি সুতো দিয়ে নিজের হাতে বোনা কাপড় চন্দ্রপ্রভা এই যজ্ঞে অর্পণ করেছিলেন। সেই জন্য জ্যোতিপ্রসাদ তাঁকে খদ্দরের কাপড় উপহার দিয়েছিলেন। এরপর থেকেই চন্দ্রপ্রভা খদ্দরের কাপড় পরতে শুরু করেন।

        মহিলা সমিতি এবং ছাত্র সম্মেলনের সাংগঠনিক কাজ ছাড়াও তেজপুরে আসার পরে চন্দ্রপ্রভা সাহিত্য চর্চাতে ও মনোনিবেশ করেন।  চন্দ্রপ্রভার প্রথম লেখা 'বাঁহী' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। চন্দ্রপ্রভা অসমিয়া ভাষায় দ্রুত এবং খুব সুন্দর লিখতে পারতেন। ছাত্রীদের রচনা লেখার ক্ষেত্রে মিশনারিরা খুব জোর দিতেন। আমেরিকান মিশনারিরা নিজেরাও অহরহ প্রতিবেদন এবং চিঠি লেখায় সিদ্ধহস্ত ছিলেনসমস্ত কাজের তন্নতন্ন খতিয়ান তুলে ধরে স্বদেশে নিয়মিত প্রতিবেদন এবং চিঠি লিখে পাঠানোর ক্ষেত্রে নিয়ম বড় কঠোর ছিল। ব্যাপ্টিস্ট মিশনারিরা  শিবসাগর থেকে ১৮৬৪ সালে প্রকাশিত 'অরুণোদ' পত্রিকায় প্রথমবারের জন্য মহিলার লেখা প্রকাশ করেন। মিশনারিদের পত্নী কয়েকজন ছাড়াও অসমিয়া দুই এক জন ক্রিশ্চান মহিলা সংক্ষিপ্ত লেখা নিয়ে এই পত্রিকায় আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। 'অরুণোদ'-এর  প্রকাশ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে  জোরহাট থেকে  'দীপ্তি' নামে  একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের মহিলা বিদেশ মিশন সমাজ 'হেলপিং হ্যান্ড' নামে  মহিলাদের কাজ সম্পর্কে  লেখা একটি আলোচনা পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন।  নগাঁও মিশনে ছত্রিশ বছর চাকরি করে কাটানো মিসেস পি এইচ  মূর  তার মিশন অভিজ্ঞতার ওপরে  ভিত্তি করে  ১৯০০-১৯১৬  সনের মধ্যে  চারটি বই প্রকাশ করেন। অবশ্য চন্দ্রপ্রভার সঙ্গে মিসেস মূরের দেখা হয়নি। তাঁর স্বামী রেভারেন্ড পিট মূরের ১৯১৬  সালের মার্চ মাসে মৃত্যু হয়। শ্রীমতী মূরের শেষ বই 'স্ট্রে লিভস ফ্রম অসাম' ১৯১৬ সনে প্রকাশিত হয়। মিসেস মূর অন্য  মিশনারি মহিলার মতো  অসমিয়াতে বই লিখেছিলেন। ১৮৯০-৯২ সালের মধ্যে  তিনি শিশুর জন্য লেখা  'লাইন আপন লাইন' নামে বাইবেলের একটি কাহিনি অসমিয়া ভাষায় অনুবাদ করেন। চন্দ্রপ্রভা স্কুল লাইব্রেরীতে 'অরুণোদই' এবং 'দীপ্তি' ব্যাপ্টিস্ট মিশনারি মহিলাদের লেখা  এবং শিবসাগরের  ব্যাপ্টিস্ট মিশনের  ছাপা যন্ত্রে  তখনকার দিনের বিরল অসমিয়া ভাষার বই পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। প্রথম অসমিয়া মহিলা লেখিকা পদ্মাবতী দেবী ফুকননীর বাল্যকাল এবং বিবাহিত জীবন নগাঁও শহরে অতিবাহিত হয়েছিল। মিশনারি মহিলারা বই লেখা ছাড়াও শিবসাগর এবং নগাঁওয়ের ভদ্রলোকদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে অন্তপুরের মহিলাদের হাতে বই তুলে দিয়েছিলেন। এভাবে আমেরিকান মিশনারিদের সৌজন্যে স্কুলের মুখ না দেখা, অন্তঃপুরে জীবন কাটানো অসমিয়া মহিলারা  নিজের মাতৃভাষা অসমিয়া পড়তে এবং লেখার সুযোগ লাভ করেছিল। তেজপুরে চন্দ্রপ্রভা মাত্র কয়েক বছর ছিলেন। কিন্তু এই স্বল্প সময়ই চন্দ্রপ্রভার জীবন পাত্র এভাবে ঐশ্বর্যে ভরিয়ে তুলল যে সমগ্র জীবন জুড়ে তিনি সেই ঐশ্বর্যের সাগরে অবগাহন করে কাটালেন। অন্যদিকে প্রাচুর্যে ভরা দিনগুলিতে তাঁর জীবনে এমন একটি ঘটনা ঘটল যে এটা তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের গতিকে পরিবর্তিত করে দিল তেজপুরে কর্মোদ‍্যমে উজ্জ্বল হয়ে থাকা সেই দিনগুলি ছেড়ে তিনি দৈশিঙরীতে ভবিষ্যতের আগত দিনগুলির জন্য মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি নিলেন। শুরু হল ত্যাগ এবং সংগ্রামের জীবন।

 

 

আমাদের চন্দ্রপ্রভা শইকীয়ানী - ৭ (বাসুদেব দাস)

  অতুলের জন্মের পর থেকে দণ্ডিনাথ কলিতা চন্দ্রপ্রভাকে মাসে দশ টাকা করে পাঠাতেন । এই ১০   টাকা দিয়েই মা ছেলেকে সারা মাস চালাতে হত। সেই সময় ...