সোমবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০২১

আমাদের চন্দ্রপ্রভা শইকীয়ানী - ৭ (বাসুদেব দাস)


 

অতুলের জন্মের পর থেকে দণ্ডিনাথ কলিতা চন্দ্রপ্রভাকে মাসে দশ টাকা করে পাঠাতেন । এই ১০  টাকা দিয়েই মা ছেলেকে সারা মাস চালাতে হত। সেই সময় এটা অসম্ভব ছিল না ভাই ধর্মও সেসময় দরঙের  কোনো এক সাহেবের গাড়ি চালিয়ে বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক প্রায় ত্যাগ  করেছিলেন। বোন রজনীপ্রভা কলকাতায় মিশনারিদের সাহায্যে ডাক্তারি পড়ছিলেন। রজনীপ্রভা মাসিক ১০৫ টাকা বৃত্তি পেয়ে তার থেকে ৩৫ টাকা প্রভার কাছে ঘর চালানোর খরচ  হিসেবে পাঠাতেন। এই সময়ে অর্থাৎ ১৯২৩ সনের শেষের দিকে  চন্দ্রপ্রভাকে  কালজিপাড়ার বালিকা বিদ্যালয়ের দায়িত্ব নিতে হয়। কালজিপাড়ার জনগণের আগ্রহ, বিশেষ করে বরপেটার লোকাল বোর্ডের চেয়ারম্যান লোহিত নায়কের আগ্রহ এবং অনুরোধে তিনি এই দায়িত্ব গ্রহণ করতে বাধ্য হন। এদিকে শিশু অতুলের খরচ বেড়েই চলেছিল তাই নিজের প্রয়োজনের জন্যও তিনি চাকরিটা গ্রহণ করলেন। সেই সময়ের নিরিখ অনুযায়ী তার বেতন ছিল মাসে ত্রিশ টাকা। শুরুর দিকে তিনি বাড়ি থেকে স্কুলে যাওয়া আসা করতেন। এক বছরের অতুলকে কোলে নিয়ে স্কুলে যাওয়া আসা করতে দেখে কালজিপাড়ার একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি গোপীনাথ মেধি  প্রতিদিন ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে দূর থেকে আসা যাওয়ার পরিবর্তে তাঁর বাড়িতে থাকার প্রস্তাব দিলেন। গোপীনাথের পিতা সমর বায়ন কামরূপের প্রজা বিদ্রোহে গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ করেছিলেন। গোপীনাথও গান্ধিজির আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন। তাই এমন একটি পরিবার গ্রামের অন্যান্য লোকদের চেয়ে অনেকটাই উদার ছিল। কালজিপাড়ার বালিকা বিদ্যালয়ে চন্দ্রপ্রভা ১৯২৬  সন পর্যন্ত শিক্ষকতা করেন। এই সময় বিভিন্ন গঠনমূলক কার্যসূচি ছাড়া স্বাধীনতার আন্দোলন স্তিমিত হয়ে এসেছিল। তাই চন্দ্রপ্রভা স্কুলে শিক্ষকতা করা, সামাজিক  সামাজিক কুসংস্কার দূর করা, সুতোকাটা ইত্যাদি কাজে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছিলেন। সম্ভবত এই সময় থেকেই তিনি গল্প উপন্যাস লিখতে শুরু করেন। শৈশব থেকেই চন্দ্রপ্রভা যেকোনো বৈষম্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে দ্বিধা করতেন না। এইকালজিপাড়াতেও জাতির নামে সমাজে যে কুসংস্কার প্রচলিত ছিল চন্দ্রপ্রভা তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালেন। কালজিপাড়া গ্রামের সত্রের কাছে একটা কীর্তন ঘর ছিল। কীর্তন ঘরের সীমানার মধ্যে লোকাল বোর্ডের একটি কুয়ো ছিল। কুয়োর জল তোলার ক্ষেত্রে তথাকথিত উচ্চবর্ণের লোকরা নিম্নবর্ণের লোকদের উপর বাধানিষেধ আরোপ করেছিল। চন্দ্রপ্রভা সে কথা জানতে পেরে সত্রাধিকারের কাছে এর প্রতিকারের আবেদন জানালেন। যুক্তির দ্বারা বুঝিয়ে দিলেন যে তথাকথিত নিচু জাতির  স্পর্শে জল কখনও অস্পৃশ‍্য হতে পারে না। সত্রাধিকার চন্দ্রপ্রভার যুক্তিতে আস্থা স্থাপন করে কুয়োর জল সবার জন্য মুক্ত করে দিলেন।

এভাবে কালজিপাড়ায় চন্দ্রপ্রভার প্রায় তিন বছর অতিক্রান্ত হয়ে যায়। এখানে থাকার সময়েই ১৯২৫ সনে নগাঁও শহরে অনুষ্ঠিত অসম সাহিত্য সভার অষ্টম বার্ষিক অধিবেশনে তিনি প্রতিনিধি হিসেবে যোগদান করেন । স্কুল থেকে ছুটি নিয়ে চন্দ্রপ্রভা শিশুপুত্র অতুলকে সঙ্গে নিয়ে এই সভায় যোগ দিয়েছিলেন। সাহিত্য সভার এই অধিবেশনকে অসমের নারী আন্দোলনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বলা যেতে পারে। পরবর্তীকালের অসমের নারী আন্দোলনের বীজ এতে অঙ্কুরিত হয়েছিল বলা যেতে পারে।

 ১৯২৬ সনের ২৬ ডিসেম্বর থেকে ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত গুয়াহাটির পান্ডু নগরী অনুষ্ঠিত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ৪১ তম অধিবেশনটি এস শ্রীনিবাস আয়েঙ্গারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় গান্ধিজি ছাড়াও নেহেরু, বল্লভ ভাই প্যাটেল, রাজেন্দ্রপ্রসাদ,মদনমোহন মালব্য, মহম্মদ আলি, শওকত আলি, সরোজিনী নাইডু ইত্যাদি বিশিষ্ট কংগ্রেস নেতারা যোগদান করেছিলেন। চন্দ্রপ্রভা কংগ্রেস জনসভায় যোগ দেওয়ার জন্য ছুটির আবেদন করলেন। কিন্তু স্কুল কর্তৃপক্ষ ছুটি মঞ্জুর করলেন না। চন্দ্রপ্রভা খুব দুঃখ পেলেন। যে সময়  সমগ্র দেশ দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছিল সেই সময় তার স্কুল সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ হয়ে থাকবে কি? তিনি কংগ্রেস মহা সভায় যোগ দেবার জন্য চাকরিতে ইস্তফা দিলেন।

নারীর অধিকার সম্পর্কে চন্দ্রপ্রভা কিশোরী বয়স থেকেই সচেতন ছিলেন। এই সচেতনতা তার মজ্জাগত  ছিল এবং এটাই পরবর্তীকালে তার আদর্শ হয়ে পড়ে। এই আদর্শ তার মনে রোপণ  করায় গান্ধিজির লেখা সমূহ এবং তার নেতৃত্বের তৎকালীন কংগ্রেসের নারী এবং সমাজে নারীর ভূমিকা সম্পর্কীয় এবং কার্যাবলী ও সাহায্য করেছিল।

চন্দ্রপ্রভা পিতার মৃত্যুর পরে তাঁর অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে ভাই ধর্মেশ্বর পিতৃ সম্পত্তি বিক্রি করে টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়। ছেলেদের মতো মেয়ে ও পিতার সম্পত্তির অধিকারিনী এই বিশ্বাসে বলীয়ান চন্দ্রপ্রভা পিতার সম্পত্তি উদ্ধারের জন্য মামলা করেছিলেন এবং সম্পত্তির কিছু অংশ উদ্ধার করে মা এবং পিতৃ-মাতৃহীন ভাগ্নের থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।

চন্দ্রপ্রভার সাহিত্য তথা অসম সাহিত্যসভার প্রতি ছোটবেলা থেকেই আকর্ষণ ছিল। এই আকর্ষণের টানেই তিনি ‘বাঁহী’, আবাহন’-এ লিখতে শুরু করেন। ‘অভিযাত্রী’ নামে পত্রিকা সম্পাদনা শুরু করেন।

আমাদের চন্দ্রপ্রভা শইকীয়ানী - ৭ (বাসুদেব দাস)

  অতুলের জন্মের পর থেকে দণ্ডিনাথ কলিতা চন্দ্রপ্রভাকে মাসে দশ টাকা করে পাঠাতেন । এই ১০   টাকা দিয়েই মা ছেলেকে সারা মাস চালাতে হত। সেই সময় ...